লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৭০১ বার
শেক্সপিয়ারের মেয়েরা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
শনিবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৬

নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪—১৬১৬) সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনি কাহিনীর উদ্ভাবক নন; যেখানে ভালো গল্পের আভাস দেখেছেন, সেখানেই হানা দিয়েছেন, অন্যের লেখা নাটক, প্রচলিত লোককাহিনী, লিপিবদ্ধ ইতিহাস, প্রাচীন সাহিত্য কোনো উত্সই বাদ রাখেননি, নাটকের জন্য কাহিনীর কাঠামো খুঁজতে গিয়ে। কিন্তু এটাও সত্য যে, কাঠামোটিই শুধু নিয়েছেন, অনেক সময় তাকেও দিয়েছেন বদলে, আর ভেতরের প্রাণ, নাটককে যা প্রাণবন্ত রাখে, সেটা সম্পূর্ণই শেক্সপিয়ারের নিজস্ব, স্ব-আয়োজিত।


তার পরও সত্য হলো এই যে, এ নাট্যকার যে অমন বিশ্বনন্দিত ও সর্বজনীন বলে স্বীকৃত, তার কারণ নাটকের উপাখ্যান নয়। কারণ হচ্ছে নাটকের ভেতরকার চরিত্র। চরিত্রই প্রধান। চরিত্রই বদলে দিয়েছে কাহিনীর কাঠামো। অনেক সময় পাঠক কিংবা দর্শক হিসেবে ঘটনা আমাদের মনে থাকে না, মনে থাকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত, ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত, ঘটনার সৃষ্টিকারী মানুষগুলোকে। এ মানুষগুলো একই সঙ্গে নাট্যকারের সমসাময়িক এবং কালোত্তীর্ণ, অর্থাত্ যেমন তারা সেকালের, তেমনি তারা চিরকালের।


নাটকের ক্ষেত্রে শেক্সপিয়ারের ছিল সেই অসামান্য শক্তি, যেটিকে রোমান্টিক কবি, জন কিটস চিহ্নিত করেছেন নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি হিসেবে। অন্যভাবে বলতে গেলে, এ হচ্ছে একজন শিল্পীর পক্ষে নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার ক্ষমতা। এ ক্ষমতা যে শিল্পীর থাকে, তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, নিজের গণ্ডি অতিক্রম করে এক হয়ে যান তারই উদ্ভাবিত চরিত্রের সঙ্গে। তিনি আর তার নিজের নন, তিনি তারই হাতে তৈরি সব চরিত্রের। বিশেষভাবে কোনো একজনের নন। নির্বিশেষরূপে সবার। যেমন পুরুষের তেমনি মেয়েদের। নায়কের যেমন তেমনি আবার দুর্বৃত্তের।


তবু শেক্সপিয়ার তো একজন ব্যক্তিও। এই ব্যক্তি বাস করেছেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে, অবস্থান ছিল তার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতে। ব্যক্তিগতভাবে সুখ-দুঃখের নানা অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। তিনি প্রেমেও পড়েছেন। একজন নারী তাকে অত্যন্ত জ্বালাতন করেছেন, এমন সত্যভাষণ প্রেমকে উপজীব্য করে লেখা তার সনেটগুলোয় পাওয়া যায়। এ নারীকে তিনি কৃষ্ণকায় রমণী বলে উল্লেখ করেছেন। আবার এ প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রশংসা করতেও শেক্সপিয়ার কার্পণ্য করেননি। প্রেমিকাটি আকর্ষক, রহস্যময় ও ধ্বংসাত্মক, একাধারে।


এটি ব্যক্তিশেক্সপিয়ারের নিজস্ব অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা যে নৈর্ব্যক্তিক নাট্যকারের আঁকা মেয়েদের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়নি, তা বলা যাবে না। সেখানেও এমন মেয়ে আছে, যে ধ্বংস করে। যেমন ‘অ্যান্টনিও অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’র ক্লিওপেট্রা ও ‘ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা’র ক্রেসিডা। আবার এমনও চরিত্র পাওয়া যাবে যারা সর্বস্বত্যাগিনী, যেমন ‘কিং লিয়রে’র কনিষ্ঠ কন্যা কর্ডেলিয়া, ওথেলোপত্নী ডেসডিমোনা, হ্যামলেট নাটকে বিপন্না ওফেলিয়া। কিন্তু এদের আত্মত্যাগ করার ক্ষমতা এদের নিজেদের জন্য সুখ বয়ে আনেনি এবং এদের আপনজনকেও স্বস্তি দেয়নি। বরং যেমন নিজের জন্য, তেমনি ভালোবাসার জনের জন্যও ধ্বংসকে নিয়ে এসেছে, পথ দেখিয়ে। একই বক্তব্য যুবক রোমিও এবং অল্পবয়সী অতি আন্তরিক জুলিয়েট সম্পর্কেও সত্য। সত্য তা লেডি ম্যাকবেথ সম্পর্কেও। ওই নারী যদি অত অনুগত না হতেন তার স্বামীর, অনুক্ষণ অমনভাবে চিন্তা না করতেন স্বামীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থকরণ বিষয়ে, তাহলে নিজেও বাঁচতেন, বাঁচতেন তার স্বামীও।


মেয়েরা একটা শক্তি। এ শক্তি দাম্পত্য সুখের ভিত তৈরি করতে পারে, যেমনটা আমরা দেখতে পাই শেক্সপিয়ারের কমেডিতে। ট্র্যাজেডিতে যা ধ্বংসাত্মক, সেই শক্তি কমেডিতে সৃজননিমগ্ন। কিন্তু যা-ই করুক, সৃষ্টিতে কিংবা ধ্বংসে মেয়েরা রহস্যময়ই রয়ে যায়। পুরুষ থেকে তারা ভিন্ন। তারা আকর্ষণীয়।


কিন্তু কার জন্য? পুরুষের জন্য এবং পুরুষের দৃষ্টিতে। দৃষ্টিটা যে পুরুষের, এটা মানতেই হবে। মেনে নিয়ে তার পর অন্য সব বিবেচনা। ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফ কল্পনা করেছেন শেক্সপিয়ারের একজন বোন ছিল, নাম তার জুডিথ। এ মেয়েটিও ছিল ভাইয়ের মতোই প্রতিভাবান। ভাইয়ের মতোই সেও বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। কেননা সে বিয়ে করে নিজেকে নিঃশেষ করতে সম্মত হয়নি। কিন্তু সে নাট্যকার হয়নি, অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে এবং সেই দুঃখে আত্মহত্যা করেছে। না পালালেও সে নাট্যকার হতো না। ঘর-গৃহস্থালি তাকে শেষ করে দিত। ঘর-গৃহস্থালির ধ্বংসাত্মক ভূমিকার কথা লেনিন বলেছেন। বিপ্লবের পরে ১৯৯১ সালে নারী শ্রমিকদের এক সম্মেলনে লেনিন বলেছিলেন, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ঘরকন্না সবচেয়ে অনুত্পাদক, সবচেয়ে বর্বর, সবচেয়ে হাড়ভাঙা শ্রম; যা মেয়েরা করে। এ মেহনত অতিশয় তুচ্ছ, তার মধ্যে এমন কিছু নেই, যা মেয়েদের বিকাশে এতটুকু সাহায্য করে।’


শেক্সপিয়ারের সময়ে ইংল্যান্ডে মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে মাত্র, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কিছু ছিল না, সমাজে তারা প্রধান নয়। সংস্কৃতিতেও তারা প্রান্তবর্তী। শেক্সপিয়ার নিজে উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক। তিনি পেশাজীবী একজন। এ পেশাজীবী নাট্যকার একজন অভিনেতাও ছিলেন, পরে গ্লোব থিয়েটারের মালিকদের অন্যতম হয়েছেন বলে শোনা যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত তখন নাটক দেখে না। নাটক দেখে বিত্তবান মানুষ ও সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ তার নিজের জীবনকাহিনী জীবনে বিস্তর দেখে, প্রতিদিনই দেখতে পায়, নাট্যালয়ে গিয়ে কাহিনীর পুনরাভিনয় দেখতে চায় না, তারা বরং চায় বিত্তবানদের জগত্টাকে দেখে আনন্দ পেতে। আর বিত্তবান যারা তারা কি আর নিচের দিকে তাকাবে, নাটকীয় ঘটনার খোঁজে? নিজেদের দিকে তাকালেও তাকাতে চাইতে পারে, কিন্তু তারা পছন্দ করবে তাদের চেয়েও সম্ভ্রান্ত যারা, কিংবা যারা দূরবর্তী নগরের বা অতীত ইতিহাসের, সেসব মানুষের কাণ্ডকারখানা দেখতে।


সেজন্য লক্ষ করা যাবে যে, শেক্সপিয়ারের নাটকে মধ্যবিত্ত নেই, গরিব মানুষ আছে যত্সামান্য, সেখানে সবটাই অভিজাতদের কাজকর্ম, তাদের জীবনযাপনের অনুলিখন, কখনো গম্ভীর, কখনো কৌতুকপূর্ণ। অভিজাতদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সমস্যা, আকর্ষণ-বিকর্ষণই সেখানে প্রধান হয়ে আছে। শেক্সপিয়ারের দৃষ্টিভঙ্গিটাও অভিজাতধর্মী। তার নাটকের সর্বজনীনতা ওই ভিত্তির ওপরে গড়ে উঠেছে; তবে ভিত্তিতে আটকে থাকেননি তিনি, গাছ যেমন আটকে থাকে না, মাটির ওপর দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু উঠে যায় আকাশের দিকে। ওঠে বলেই সে বৃক্ষ, নইলে হতো গুল্ম-লতা।


শেক্সপিয়ার পুরুষ মানুষ। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিটাও কার্যকর, অসামান্য শেক্সপিয়ারের ক্ষেত্রেও। যেজন্য মেয়েরা অধস্তনই রয়ে গেছে। এ সত্য একটি বাস্তবতা। সেকালে মেয়েদের স্থান দ্বিতীয়ই ছিল। এখনো যে বদলেছে, তা নয়। প্রথম হয়নি; সমান যে হয়েছে তাও নায়। তবে মেয়েদের অবস্থান নিয়ে এখন যেসব প্রশ্ন উঠেছে, মেয়েরা নিজেরাই তুলছে, তখন তা অস্পষ্ট অনুভূতি হতে পারে কারো কারো হূদয়ে, কিন্তু ধ্বনি হয়ে ওঠেনি, বাঙ্ময় হতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০০ বছর।


তার কমেডিতে মেয়েরাই প্রধান, অনেক ক’টিতেই। কিন্তু সে প্রাধান্য সাময়িক এবং তা জীবনে মেয়েদের কর্তৃত্বের স্মারক নয় মোটেই। অধিকাংশ মেয়েরই লক্ষ্য অভিন্ন। বিয়ে করা। যাত্রা তাদের স্বামীগৃহ অভিমুখে। স্বামীই গৃহ, অনেক ক্ষেত্রে। ইসাবেলা সন্ন্যাসিনী হবে ঠিক করেছে, মঠের চৌকাঠ পেরিয়েই জানতে চেয়েছে, সন্ন্যাসের আইনকানুন কতটা শক্ত এবং আরো শক্ত নয় দেখে যেন কিছুটা অসন্তুষ্টই হয়েছে সে। সেই ইসাবেলা কী করল শেষ পর্যন্ত? না, ভিয়েনার ডিউক যেই মাত্র বলেছে, তুমি কি আমার স্ত্রী হবে, অমনি সঙ্গে সঙ্গে নতমস্তকে রাজি সে; এতটা সম্মত যে, মুখে কোনো রা নেই।


আমরা এও স্মরণ করতে পারি যে, শেক্সপিয়ারের কালে দর্শকদের ভেতর মেয়েদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। তাছাড়া এও তো জানি আমরা যে, মঞ্চে তখনো মেয়েরা পা দিতে পারেনি। নারী চরিত্র ছিল, কিন্তু নারী অভিনেতা ছিল না। পুরুষরাই অভিনয় করত মেয়েদের ভূমিকায়। যেজন্য মেয়েদের সংখ্যা বেশি করায় বাস্তবিক একটা অসুবিধা ছিল; আর সুবিধা হতো তাদের ছদ্মবেশ ধরিয়ে দিতে পারলে, শেক্সপিয়ার কখনো কখনো এ সুবিধা নিয়েছেন বৈকি, রজালিন্ড, পোর্শিয়া, ভায়োলা— এরা ছদ্মবেশ নিয়েছে; ইসাবেলা পরেছে সন্ন্যাসীর পোশাক।


শেক্সপিয়ারের নাটকে সব মেয়ে এক রকমের নয়; এক রকম হলে তাদের বৈশিষ্ট্য কমে যেত, অভাব ঘটত বৈচিত্র্যের এবং নাট্যকার হিসেবেও শেক্সপিয়ার অত বড় হতেন না। নায়িকাদের মধ্যে যেমন রয়েছে ওফেলিয়ার মতো দুর্বল মানুষ, তেমনি আবার আছে ডেসডিমোনার মতো পিতৃআজ্ঞা অবজ্ঞাকারী কন্যা। কেউ জুলিয়েটের মতো ঐকান্তিক, কেউ ক্রেসিডার মতো পক্ষপরিবর্তনকারী। রজালিন্ড বিদগ্ধ, ক্যাথেরিনা ঝগড়াটে। লেডি ম্যাকবেথ অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, গারট্রুডের মতো সরল নয়। মিরান্ডা প্রায় কিছুই জানে না, বিয়েত্রিচ অনেক কিছু জানে।


কিন্তু ঐক্য আছে, যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তারা পুরুষের প্রাধ্যান্য মেনে নেয়, মেনে নিয়ে বিয়ে করে, কিংবা করতে চায়, আর যারা ওই কাজটি করেছে, এরই মধ্যে তারা স্বামীর অনুগামী হয়ে চরিতার্থতা খোঁজে। হোক সে স্ত্রী লেডি ম্যাকবেথের মতো উচ্চাভিলাষী, কিংবা ডেসডিমোনার মতো রোমান্টিক। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিয়ে তখনো সর্বজনমান্য। কমেডির পরিসমাপ্তি তাই শুভবিবাহের ঘণ্টধ্বনিতে।


শেক্সপিয়ারের নায়িকারা সবাই বিয়ের ব্যাপারে উত্সাহী। তরুণী রজালিন্ডও মোটেই সুখে নেই, পিতা রয়েছে বনবাসে, সে এখন একা, হয়তো একাকীত্বের দরুন পিতার কথা নয় শুধু, ভবিষ্যত্ সন্তানের পিতা সম্পর্কেও ভাবছে। অথবা মিরান্ডার ব্যাপারটা দেখা যাক। দ্বীপের মানুষ সে। পুরুষ বলতে পিতাকেই দেখেছে, আর আধা-পুরুষ আধা-মত্স্য ক্যালিবানাকে। তার মা নেই। বিয়ে কী জিনিস তার জানবার কথা নয়। প্রেম সম্পর্কে শোনেনি কখনো কারো কাছে।


মিরান্ডার কোনো সখী নেই জনমনুষ্যহীন ওই দ্বীপে। কিন্তু তাকেও দেখি প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেছে ফার্ডিন্যান্ডের। সহানুভূতি জানাচ্ছে অপরিচিত ওই যুবকের কষ্ট দেখে, পিতার আদেশ লঙ্ঘনে প্ররোচিত করছে তাকে। সন্ন্যাসিনী হতে প্রস্তুত ইসাবেলার খুবই বিতৃষ্ণা পুরুষদের সম্পর্কে, কিন্তু সে খুবই রাজি বিয়েতে। যোগ্য পাত্র পেলে। অলিভিয়া ঘোষণা দিয়েছে যে, এতই পীড়িত সে পিতা ও ভ্রাতৃবিয়োগে যে, কারো প্রতি দৃকপাত করার মানসিকতা তার নেই। সাত বছর সে ঘরের বাইরে যাবে না। তাকাবে না কোনো পুরুষ মানুষের দিকে। সেই একই অলিভিয়া কিন্তু আর কারো দিকে তাকাচ্ছে না এখন, ভায়োলার দেখা পেয়ে; যে মেয়েটিকে সে পুরুষ মনে করেছে, বেচারার ছদ্মবেশের কারণে। ওফেলিয়া হ্যামলেটকে পাবে আশা করেছিল, স্বামী হিসেবে। কিন্তু স্বামী হিসেবে নয়, হ্যামলেটকে সে পেল পিতৃহন্তা হিসেবে। পেয়ে শেষে আত্মহত্যা করল মেয়েটি। হেলেনা ও হারমিয়া দুই বাল্যসখী, গলায় গলায় ভাব; কিন্তু এখন তারা পরিণত হয়েছে নিষ্ঠুরতম শত্রুতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বামী পাওয়ার ব্যাপারে। জুলিয়েট প্রাণ দিল, রোমিওকে বিয়ে করতে চেয়েছে। পোর্শিয়া খুবই হতাশ হতো বিয়ে করার মতো স্বামী না পেলে। ইহুদি জেসিকা পালিয়ে এসেছে পিতৃগৃহ ত্যাগ করে। বিধর্মী প্রেমিকের হাত ধরে। ডেসডিমোনাও তাই করেছে, বিয়ে করেছে ভিনদেশী এক কালো পুরুষকে, ওথেলোকে; যে কিনা তার পিতার বন্ধু। বাঙ্ময়ী ক্যাথেরিনকে দেখে মনে হয়েছিল, এ মেয়ে আর যা-ই করুক, কিছুতেই বিয়ে করবে না। কিন্তু একসময় পোষ মেনে নিল, পেট্রুশিওর হাতে পড়ে।


ক্রেসিডা ত্যাগ করেছে ট্রয়লাসকে, ত্যাগ করেছে বলা যাবে না, গ্রহণ করেছে ডায়োমেডিজকে। এটা সত্য। কিন্তু এই যে গ্রহণ, এটা সে করেছে বাস্তব অবস্থার চাপে। চাপটা আসলে পুরুষদের। মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অধিক বাস্তববাদী। সেই বাস্তববাদিতার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ক্রেসিডার তথাকথিত নির্লজ্জতা। নির্লজ্জ তাকে হতেই হয়, না হয়ে উপায় থাকে না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি হাত ধরে শিক্ষা দেয়, বলে কল্পনাবিলাস তোমাদের সাজে না, ওটা পুরুষদের অধিকার। সেজন্য তরুণী রজালিন্ডরা কবিতা লেখে না, তরুণ অরল্যান্ডোরা লেখে। লিখে গাছের ডালে টাঙিয়ে দেয়। তাদের কোনো সংকোচ নেই। সংকোচহীনতাই ভূষণ, তাদের জন্য।


সাহিত্যের ব্যাপারে জরুরি বিষয় হলো লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, কোন দৃষ্টিতে তিনি দেখছেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।


শেক্সপিয়ার তার সময়ের ও শ্রেণীর মানুষ, ওই দুইয়ের কর্তৃত্ব যে তার ওপর নেই, তা নয়, আছে; তবে অনেক ব্যাপারেই তিনি নিজের সময় ও শ্রেণীর হয়েও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সবকালের ও সব মানুষের লেখক হয়ে উঠেছেন। সেখানে তার শক্তির একটা বিশেষ প্রকাশ। সেখানে যে তার দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করছে, তাতে সন্দেহ নেই।


বিষয়টা পরিষ্কার হবে যদি আমার তার সমসাময়িক অন্য দুজন বড় লেখকের পাশে তাকে দাঁড় করাই। এদের একজন ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) অন্যজন বেন জনসন (১৫৭২-১৬৩৭)। শ্রেণীতে পার্থক্য ছিল অবশ্যই। প্রথম জীবনে শেক্সপিয়ারের বৈষয়িক অবস্থান ওই দুজনের মতো দৃঢ় ছিল না, পরে অবশ্য তিনিও সম্পত্তিবান হয়েছিলেন। তবে সময়টা তো প্রায় একই।


বেকন তার জগত্টাকে দেখেন বুদ্ধি দিয়ে। শেক্সপিয়ারের দেখাটা হূদয় দিয়ে। যেমন প্রেমের বিষয়। এ সম্বন্ধে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্যটা একেবারে মৌলিক। শেক্সপিয়ার মনে করেন, প্রেম নর-নারীর জীবনে একটি প্রাথমিক সত্য। তার ভুবনেও পুরুষেরই আধিপত্য। তবে ততটা নয়, যতটা বেকনের ভুবনে। বেকনের অনবদ্য প্রবন্ধগুলো পড়লে মনে হয় সবই পুরুষের জন্য লেখা, সবকিছু পুরুষালি, সেখানে মেয়েরা প্রায় অনুপস্থিত। থাকলেও রয়েছে প্রান্তবর্তী অবস্থানে। ওদিকে শেক্সপিয়ারের নাটকে মেয়েরা প্রধান নয় বটে, কিন্তু তারা আছে কেন্দ্রেই, কিংবা কাছাকাছি এবং দু-এক ক্ষেত্রে তারা পুরুষের সমান সমান। বেকন বন্ধুত্ব পছন্দ করেন, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বন্ধুত্বের কথাই ভেবেছেন তিনি, তার ‘বন্ধুত্ব’-বিষয়ক প্রবন্ধে, পুরুষে নারীতে বন্ধুত্বের প্রসঙ্গটাকে অবজ্ঞা করে। কারণ আছে। প্রেমকে বেকন মনে করেন একটি ধ্বংসাত্মক শক্তি। সৃজনশীল তো নয়ই।


এ বক্তব্যটা তিনি বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন ‘প্রেম’-সম্পর্কিত তার সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধটিতে। প্রেম নাটকের জন্য ভালো, জীবনের জন্য নয়। নাটকে দেখা যায় অধিকাংশ প্রেমে পরিণতি হয় মিলনে, কখনো যদিও ট্র্যাজেডিতেও। কিন্তু জীবনের সত্য অন্য রকম। সেখানে প্রেম পরিণামে বহু প্রকার দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নতির পথে বিঘ্নের সৃষ্টি করে। প্রেম ছাড়া অবশ্য জীবন চলে না, কিন্তু সন্দেহজনক এ শক্তিকে সবসময় পাহারায় রাখা প্রয়োজন, যাতে সে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় হস্তক্ষেপ করতে না পারে। উন্নতিতে ব্যাঘাত না ঘটায়। এই হচ্ছে বেকনের দৃষ্টিভঙ্গি। এর বিপরীতে শেক্সপিয়ার তার নাটকে প্রেমকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রেমের কাছে নাটকের ঋণ রয়েছে, বেকনের এ বক্তব্য শেক্সপিয়ারের নাটক সম্পর্কে খুবই সত্য। তার নাটক প্রেমের ঘটনায় পরিপূর্ণ। এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেমের পরিণতি ইতিবাচক, উন্মাদনা, আত্মবিহ্বলতা ইত্যাদি সত্ত্বেও।


বেকন মেকিয়াভেলির কথা বলেছেন। মেকিয়াভেলির বক্তব্য ছিল এই যে, সংসারে অসত্ লোকই সংখ্যায় অধিক ও আচরণে প্রবল, তাই সত্ হলেও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে অসত্রা বিপদে ফেলে না দেয়। সিংহের মতো সাহসী হওয়া ভালো, কিন্তু প্রয়োজনে শৃগালের মতো ধূর্তও হওয়া চাই। শেক্সপিয়ারের নাটকে মেকিয়াভেলির পরামর্শকেও ছাড়িয়ে যায় এমন চরিত্র আছে। আছে ডেনমার্কের নতুন রাজা, ভাইকে হত্যা করে যে সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়েছে, মুকুট পরেছে মাথায়। আছে ইয়াগো, যে মানুষের ভালো দেখতে পারে না। ফুল দেখলেই পায়ে দলিত করে। কিন্তু এরা কেউই নায়ক নয়। নায়ক হচ্ছে হ্যামলেট, যার অন্যান্য পরিচয়ের মধ্যে একটি অবশ্যই এই যে, সে ওফেলিয়ার প্রেমিক। ইয়াগোর প্রতিপক্ষ হিসেবে নায়ক হচ্ছে ওথেলো, নাটকে যার অবস্থান মূলত প্রেমিক ও স্বামী হিসেবে। ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ নাটকের ডিউক তার আপন ভাইকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে, অত্যন্ত ধূর্ত সে, কিন্তু সে ব্যক্তি নাটকের নায়ক নয়। নায়ক এমনকি নির্বাসিত ডিউকও নয়, নায়ক বলতে গেলে রজালিন্ডই, যার জীবনে প্রেমের চেয়ে বড় আর কিছু নেই।


নাটক হচ্ছে গণতান্ত্রিক রূপকল্প; যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আছে, সেখানেই নাটক আছে। এ মূল্যবোধ ব্যক্তিকে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করে। ব্যক্তির নিজস্বতাকে, অভিনবত্বকে মূল্য দেয়। শেক্সপিয়ারও তেমনটিই করেছেন। মর্যাদা দিয়েছেন ব্যক্তিকে, যেমন ছেলেদের তেমনি মেয়েদের। ছেলেরা প্রেমে পড়ে, মেয়েরাও পিছিয়ে থাকে না। কিন্তু সব মেয়ের প্রেম এক রকমের নয়, যেমন ছেলেদের প্রেমও হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রকারে। কর্ডেলিয়ার দুই বোনের, অর্থাত্ রাজা লিয়রের প্রথম দুই কন্যার, নাম যাদের গনেরিল ও রিগান, উভয়েই বিবাহিত, উভয়েরই প্রেমিক কিন্তু একই ব্যক্তি, যে দুর্বৃত্ত তাদের কারোরই স্বামী নয়। সেই প্রেম নিয়ে লড়াই করেছে দুই বোন, ত্বরান্বিত করেছে ধ্বংস, পরস্পরের। বিপরীতে কর্ডেলিয়ার সঙ্গে তার স্বামী, ফ্রান্সের রাজার, সম্পর্কটা অত্যন্ত শান্ত ও গভীর। ফ্রান্সের রাজা কর্ডেলিয়াকে বিয়ে করেছে কর্ডেলিয়ার সম্পত্তি দেখে নয়, তার গুণ দেখে। স্ত্রীকে ভিনদেশী এ রাজা সাহায্য করেছে পিতা লিয়রের পক্ষে সৈন্য নিয়ে ইংল্যান্ডে যেতে। সৈন্য দলসহ কর্ডেলিয়া স্বদেশে চলে এসেছে, যুদ্ধ করবে বলে। এও আরেক ধরনের প্রেম— পিতৃপ্রেম। এ প্রেম ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এর নায়িকা পোর্শিয়া দেখায় আরেকভাবে, মৃত পিতার নির্দেশ মান্য করে। অথচ একই নাটকে  শায়লক-কন্যা জেসিকা তা দেখায় না, পিতাকে ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়ে যায়, বিয়ে করে এক বিধর্মীকে।


প্রেম আসলে নানা রকমের। প্রথম দর্শনে প্রেমের ব্যাপারটাই দেখা যাক না কেন। রজালিন্ড ও অরল্যান্ডো প্রেমে পড়েছে প্রথম নেত্রপাতেই, যেমন পড়েছে সিলিয়া ও অলিভার। চাচাতো দুই বোন ও বান্ধবীর প্রেম সহোদর দুই ভাইয়ের প্রতি। এ প্রেম খুবই স্বাভাবিক মনে হয় আমাদের কাছে। এদের পরিণতিও ঘটে তাত্পর্যপূর্ণ মিলনেই। কিন্তু ওই একই নাটকে বনকন্যা ফিবি যখন প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে তরুণ গ্যানিমিডের, তখন ব্যাপারটা অত্যন্ত হাস্যকর হয়ে ওঠে। বোঝা যায়, প্রথম সাক্ষাতের প্রেম সবসময় নির্ভরযোগ্য হয় না, ক্ষেত্রবিশেষে তা মোহ ছাড়া অন্য কিছু নয়। কম উপভোগ্য নয় ‘টুয়েলফথ নাইট’-এর ঘটনাবলি। সেখানেও ওই রকমের একটা ব্যাপার ঘটে। একটি মেয়ে প্রেমে পড়ে আরেকটি মেয়ের, প্রথম দর্শনেই। অলিভিয়া পণ করেছে সাত বছরে সে কোনো পুরুষের মুখ দর্শন করবে না। কিন্তু ভায়োলাকে দেখামাত্র আর বিলম্ব করেনি, অথৈ ভালোবাসায় উতলা হয়ে পড়েছে। অথচ ভায়োলা পুরুষ নয়, সে মেয়ে, বিপদে পড়ে ছদ্মবেশ ধরেছে পুরুষের। অবশ্য অলিভিয়া যে একেবারে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, ভায়োলাকে না পাক ভায়োলার ভাইকে ঠিকই পেয়েছে সে, যমজ তারা, ভাই-বোন, দেখতে প্রায় অবিকল একই। ‘মেজার ফর মেজার’ নাটকের পরিবেশটা আলাদা। সেখানকার কাজকর্ম সে রকমের, যে রকমের ব্যাপারস্যাপার বেন জনসন তুলে ধরতে ভালোবাসেন তার নাটকে। ওই নাটকের নায়িকা ইসাবেলার দশা বেন জনসনের সিলিয়ার মতোই হতে পারত, পুরুষ মানুষগুলোর অধিকাংশই এমন অনির্ভরযোগ্য সেখানে যে ইসাবেলাকে পালাতে হয়েছিল সংসার ছেড়ে। ফিরে এল প্রেমে পড়া একটি পুরুষকে রক্ষা করার জন্যই। তার ভাইকে। এসে পড়ে গেল বিপদে। যে বিচারকের আদালতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ইসাবেলা, দরখাস্ত নিয়ে, সে লোক প্রেমে পড়ে গেল ইসাবেলার। প্রথম সাক্ষাতের এ প্রেম মোটেই প্রেম নয়,  কামনা মাত্র।


মেয়েরা রক্ষা করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখি শেক্সপিয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন আমাদের সামনে। যেমন ওপরের ওই নাটকে ইসাবেলা শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়েছে বৈকি, তার ভাইটিকে। ফাঁসির হুকুম তো হয়েই গিয়েছিল সে বেচারার, পরদিনই ভাইটির মস্তক ছিন্ন হয়ে যেত দেহ থেকে, ইসাবেলা যদি না দাঁড়াত মাঝখানে। এমনকি ওই যে অধঃপতিত বিচারক, যে ঘুষ চেয়েছিল ইসাবেলার দেহ, তাকেও ইসাবেলাই বাঁচাল শেষ পর্যন্ত, নইলে প্রাণ হারাত সে সেই একই অপরাধে, যা করার অভিযোগে সে প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছিল ইসাবেলার ভ্রাতাকে। লোকটা নিজের নাম রেখেছে অ্যাঞ্জেলো, অর্থাত্ দেবদূতের, কাজ করেনি সেই রকমের, সবেগে পতিত হয়েছে ইসাবেলাকে দেখে।


পোর্শিয়া প্রাণ বাঁচিয়েছে অ্যান্টনিওর, ভেনিসের সেই বিষণ্ন সওদাগরের, মৃত্যু যার অবধারিত ছিল, শায়লকের কাছে ঋণের দায়ে। কর্ডেলিয়াও বাঁচাতে চেয়েছিল তার পিতা রাজা লিয়রকে। প্রাণপণে চেষ্টা করেছে। পারেনি। মারা গেছে পিতা ও কন্যা, উভয়ে। ওদিকে লেডি ম্যাকবেথ চেষ্টা করেছিলেন তার স্বামীকে বাঁচাতে। তিনিও পারেননি। আত্মহত্যা করেছেন। কালপর্নিয়া যা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার স্বামী জুলিয়াস সিজারকে, সেটা করলে সিজার হয়তো বেঁচেই যেতেন, কে জানে।


লেখক হিসেবে শেক্সপিয়ারকে বলা হয় রোমান্টিক। অবশ্যই তিনি রোমান্টিক। তার কল্পনাশক্তি অসাধারণ। যার জন্য তিনি চরিত্রের গহিন প্রদেশে গিয়ে হানা দিতে পারেন এবং যা দেখেন ও বোঝেন, তাকে প্রকাশ করতে পারেন অত্যন্ত জীবন্ত, উপমাবহুল, সংগীতের স্পন্দনসমৃদ্ধ ভাষায়। কিন্তু তিনি আবার বাস্তববাদীও। তিনি রূপকথার স্রষ্টা নন, নাটকের লেখক, যে নাটক পুরোপুরি বাস্তবভিত্তিক, যেটি অন্যতম কারণ তার নাটকের সর্বজনগ্রাহ্যতার।


এ বাস্তববাদিতাই বলে দিয়েছে তাঁকে এ সত্যটি উদ্ঘাটন করতে যে, মেয়েরা অধিকতর বাস্তবতাসচেতন, ছেলেদের তুলনায়। হয়তো সাময়িকভাবে কোনো কোনো মেয়ে জিতে যায়; আসলে গুণ, শক্তি, রূপ নির্বিশেষে সব মেয়েই কমবেশি অধীনে থাকে; অনেক সময় ব্যক্তির, স্বামীর, পিতার, মাতার এমনকি প্রেমিকেরও এবং সবসময়ই একটি ব্যবস্থার। এ ব্যবস্থাটি একাধারে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং সর্বোপরি আদর্শিক। শেক্সপিয়ারের সময়ে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আসীন ছিলেন একজন নারী, যিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন শাসনকর্তা হিসেবে, যার সময়টাকে বলা হয় সে দেশের স্বর্ণযুগ। কিন্তু সে ঘটনার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় না যে, সেকালে মেয়েরা মুক্ত ছিল।


বাস্তববাদিতার কথা বলছিলাম। মেয়েরা অধিক বাস্তববাদী। রজালিন্ড কবিতা লেখে না, তার প্রেমিক অরল্যান্ডো লেখে। ম্যাকবেথ ভবিষ্যত্ দেখেন, লেডি ম্যাকবেথ দেখেন বর্তমানকে এবং পরে কাতর হন অতীত স্মরণ করে। অতীত হচ্ছে ঐতিহ্য, সে ঐতিহ্যের বাইরে যাওয়াটা কঠিন, ব্যক্তির পক্ষে যেমন সমষ্টির পক্ষেও তেমনি। ঐতিহ্য আদর্শের সৃষ্টিতে উপাদান জোগায় এবং সেই আদর্শটা হচ্ছে মেয়েদের দ্বিতীয় স্থানে রাখা। এ আদর্শে পুরুষ তো বিশ্বাস করেই, মেয়েরাও করে। বাধ্য হয় বিশ্বাস করতে। নইলে তারা বর পাবে না, অবিবাহিত থাকতে হবে।


মেয়েরা থাকে অরক্ষিত। তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত। তাদের কেউ দেখে কাম্য বস্তু হিসেবে। কেউ রাখতে চায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি করে। লোভাতুর পুরুষের হাত থেকে বাঁচার জন্য মেয়েদের ছদ্মবেশ নিতে হয়। রজালিন্ড সাজে শিকারি, ভায়োলা ভূমিকা নেয় ভৃত্যের, ইসাবেলা গ্রহণ করে সন্ন্যাসিনীর পোশাক। আর প্রায় সবাই চায় বিয়ে করতে। দজ্জাল ক্যাথেরিনা পর্যন্ত। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের জন্য বিয়ের প্রয়োজনীয়তা অধিক। অন্তত সেকালে ছিল। একালেও যে বদল হয়েছে তা বলা যাবে না।


রোমান্টিক মেয়েরাও আছে। তারা দুঃখ পায়। যেমন পেয়েছে ডেসডিমোনা। পেয়েছে ওফেলিয়া। পায় মিসরের রাসী ক্লিওপেট্রা। ওদের মৃত্যুবরণ করতে হয় অকালে। পরী-রানী যখন তাঁতি বটমের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, প্রশংসা করছে তার অনিন্দ্য কণ্ঠস্বরের, তখন গর্দভরূপী বটম তাকে সংশোধন করে দেয়; বলে প্রেম ও যুক্তি একসঙ্গে যায়, এমন কথা সে শোনেনি।


শেক্সপিয়ার উপন্যাস নয়, নাটক লিখছিলেন, তাই জীবনের সবটা ছবি তুলে ধরতে পারেননি, নাটকীয় মুহূর্তগুলোকে ছেঁকে তুলতে হয়েছে। তবে চেষ্টা সর্বদাই করেছেন সরোবরে আকাশকে প্রতিফলিত করতে। নাটকের প্রাণ থাকে দ্বন্দ্বে। শেক্সপিয়ার দ্বন্দ্ব দেখেছেন ভালো ও মন্দে। একটা দ্বন্দ্ব ছিল শহরের সঙ্গে প্রকৃতিরও। শহর ক্রমান্বয়ে প্রবল হচ্ছে, উন্নততর হচ্ছে, শেক্সপিয়ার গ্রামের লোক, সেখান থেকে এসেছিলেন শহরে, জীবিকার অন্বেষণে, পরে সচ্ছল অবস্থায় ফিরে গেছেন পৈতৃক বাসভূমিতে। প্রকৃতির প্রতি তার পক্ষপাত রয়েছে। যখন পারেন তখনই নায়ক-নায়িকাদের পাঠিয়ে দেন বনে কিংবা দ্বীপে, যদিও আদর্শায়িত করেন না ওইসব স্থানকে। সেই সঙ্গে স্বাভাবিকতা চান নর-নারীর সম্পর্কে, বসন্তের প্রসারতা চান শীতের সংকোচনের পরিবর্তে। ওই স্বাভাবিকতা নানাভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন।


বিঘ্নগুলোকে তিনি চিহ্নিত করেছেন তার লেখায়। ট্র্যাজেডিতে, কমেডিতে, ঐতিহাসিক নাটকে। কমেডিতে তিনি কৌতুকপরায়ণ। কমেডিতে মেয়েরাও হাস্যকৌতুক খুব পছন্দ করে। কৌতুক এক ধরনের অবগুণ্ঠন। বাস্তবতাটা কঠিন, সেখানে মেয়েরা অধীনেই থাকে, বিয়ে করে, কিন্তু সবসময় যে উপযুক্ত পাত্র পায় তেমন নয়। সব বিয়ে যে সুখের হয় তাও নয়। ডেসডিমোনার বিয়ে তো সুখের হয়নি। হ্যামলেটের মা বিষণ্ন থাকেন। করিওলেনাসের মায়ের ইচ্ছা পূরণ হয় না; কালপর্নিয়া ও পোর্শিয়া স্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ মনোরথ, তবু বিবেকের দিকেই প্রবল ঝোঁক তাদের। দৈহিক প্রয়োজন আছে। রয়েছে আদর্শগত অনুপ্রেরণা, যে আদর্শ বলে দেয় যে, সন্তানের জন্মদান ও প্রতিপালনেই রয়েছে নারীজন্মের সার্থকতা। তাছাড়া প্রয়োজন রয়েছে নিরাপত্তার এবং সামাজিক স্বীকৃতির। বিয়ে ভিন্ন উপায় কি! এ বাস্তবতার ভেতর আবদ্ধ অবস্থায় মেয়েরা কৌতুক করে, পরিহাসের মধ্য দিয়ে সহনীয় করে নেয় তাদের অধীনস্থ অবস্থানকে। ঝগড়াও এক প্রকারের বিনোদন বৈকি। যদিও ওপর থেকে দেখলে ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হয়, যেমন মনে হয়েছে পরীরাজ্যের দুষ্টু সদস্য পাকের কাছেও, ‘মিডসামার নাইটস ড্রিম’-এ।


মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় বাকনিপুণ। এটিও এসেছে ওই কৌতুকবোধ থেকেই। তাছাড়া সেকালে সুন্দরভাবে কথা বলাকে বেশ গুরুত্ব দেয়া হতো। তখন টেনিস খেলা ছিল না, কিন্তু টেনিস খেলার দর্শক ছিল; ওই দর্শকরা থিয়েটারে যেত বাদাম চিবুতে চিবুতে বিদগ্ধ কৌতুককর অপ্রত্যাশিত বাক্যলহরার যুদ্ধ দেখত এবং উপভোগ করত। মেয়েরা যুদ্ধে যেতে পারত না, বাকযুদ্ধে সেই না পারার শোধ নিত। শেক্সপিয়ার নিজেও উইটের খুব ভক্ত ছিলেন।


পরিশেষে একটা কথা বলা যায়। নারী চরিত্র পর্যবেক্ষণ ও উপস্থাপনে শেক্সপিয়ারের যে অতুলনীয় পারদর্শিতা, তাতে এ তত্ত্বের একটি সমর্থন আছে যে, বড় মনীষার মধ্যে পুরুষ ও নারী একসঙ্গেই থাকে। শেক্সপিয়ার যেন ওই তত্ত্বেরই একটি বড় দৃষ্টান্ত।
(শেকসপিয়ারের মেয়েরা গ্রন্থ থেকে সংকলিত)


সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com