লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৭৫৫ বার
বাবার চশমা
জনৈক
শনিবার, ১৮ জুন ২০১৬
 

চোখ যদি বিশেষ একটা ইন্দ্রিয় হয়ে থাকে এবং তা যদি বয়সের কারণে কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেই কারণে জগতে আলো দেখার অযোগ্য হয়ে যায়- তাতে দুঃখ পেয়ে কেঁদে ফেলা কারো কাছে খুব আর্শ্চযের ব্যাপার নয়। আমার বাবা এখন কাঁদছে। এতে কেউ অবাক না হলেও বাবার চোখের জল আমার চোখের দৃষ্টিপথকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করে দিয়েছে আর গভীর করে তুলেছে বুকের ভেতরে নীরব হাহাকার। আমি কোনো মতে চোখের জল সংবরণ করে অসাড়, মৃতদেহের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। আমার চোখ ফেটে অশ্র“জল নয় যেন এখনই বেরিয়ে আসবে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। আমি এতটা ব্যথিত, এতটা দুঃখিত আগে কখনো হয়েছি কিনা সেটা মনে করতে ব্যয় হল কিছুক্ষণ। কিন্তু মনে করতে পারিনি। না, আমি কখনো এত ব্যথা, এত আঘাত পাইনি। আমার এখনকার যন্ত্রণার কথা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। শিকারী কতৃক নিক্ষেপিত তীরে আহত হলে বনের হরিণ যেরকম যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে তেমনি আমি এখন যন্ত্রণাক্লিষ্ট হয়ে আছি। বাবার দিকে তাকিয়ে ভাবি, আমাদের জন্য সারাটা জীবন কত কষ্টই না করেছে। আমাদের অনাগত দিন কিভাবে কাটবে, আমাদের অনাহূত সন্তান-সন্ততি কি উপায়ে বাঁচবে এখনো তা ভেবে ভেবে দিনরাত কাটায়। এমন নয় যে, আমার বাবা সরকারি চাকরি থেকে সদ্য অবসর নিয়ে অকর্মা হয়ে গেছে বলে এখন আত্মজীবনী লিখে দিনযাপন করছেন কিংবা নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে বলে থিসিস লিখে লিখে কাটে তার অহর্নিশি অথবা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী হয়ে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করে আছেন। অবসর নেওয়া সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিংবা সরকারের দায়ীত্বশীল মন্ত্রী এসব কিছুই হয়নি বা হতে পারেনি বলে আমার মতো হতচ্ছাড়া, অপদার্থের পিতা হয়ে চোখের আলো হারিয়ে জীর্ণ শরীর আর বিশীর্ণ কাপড়ে মাটির ঠাণ্ডা মেঝের ওপর শুয়ে আছে এখন। আসলে শুয়ে নয়, আমাদের ঘরের নিকানো মাটির মেঝেতে পড়ে আছে। তার ক্লান্ত মুখখানি শুকনো ও ঘামে তৈলাক্ত দেখাচ্ছে। হাল্কা সুতি কাপড়ে তৈরি গায়ের জামাটি ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে ঘরের ভেতর গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। হাড্ডিসার অপরিচ্ছন্ন শরীরখানি ক্ষীণজীবী ও অসহায় মনে হচ্ছে। বাবার অমন বিকৃত চেহারা দেখে আমার বুকের বাঁ পাশে এক ধরনের ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। এক সময় টগবগে তাজা রক্তের চঞ্চলতা আর মাংসপেশীর দৃঢ়তায় কর্মে অক্লান্ত ছিল যে মানুষটি, সে আজ কেমন অসহায়!


বাবা একটু আগে খাট থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিল। উঠে দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে চাইলেও পারছিল না। বাবাকে এভাবে বারবার ছোট বাচ্চার মতো হামাগুড়ি দিতে দেখে মা ভয় পেয়ে ভাঙা গলায় চিৎকার করে আমাকে ডেকেছিল, ‘হাসু অ হাসু!’

আমি কর্মস্থলে অর্থাৎ স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। ডাক শুনে ছুটে গিয়ে মায়ের কাছে দাঁড়াতেই মা রান্নাঘরে হলুদ-বাটায় রঙিন শীর্ণ হাতখানা বাবার দিকে ধরে চোখ বড়ো করে বলেছিল, ‘ওই দ্যাখ্!’


বাবাকে ওভাবে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে আমি ভয় পেয়ে তাকে ধরে মেঝে থেকে ওঠাতে যাচ্ছিলাম অমনি মা পেছন থেকে আমাকে বলে উঠেছিল, ‘আহা, ধরিস নে। বাহাদুরি যখন দেখাতে চাচ্ছে, দেখাক না।’


মা যে বাবাকে কটাক্ষ করছে বাবা তা বুঝল কিনা জানি না, তবে আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি। প্রায়ই আমার বাবা এবং মা’র মাঝে এ রকম কপট কটাক্ষ কিংবা তাচ্ছিল্যের ঘটনা ঘটে। এখন মা যেন বাবাকে শুধু কটাক্ষ বা তাচ্ছিল্য নয়, রীতিমতো উপহাস করল। বাবা কিছু বলেনি। আমার সহজ-সরল বাবা এমনই।


বাবার চশমার ডাঁট ভেঙে গেছে। কিন্তু সে কথা বাবা আমাকে কিংবা মাকে বলেনি অথবা মা কিংবা বাবা কেউ আমাকে বলেনি। চশমা ছাড়া বাবা যে একেবারে অচল, হাঁটাচলা করতে পারে না সে কথা মা এবং আমি জানি। বাবা চশমা ছাড়া এতটাই অচল যে, বিছানা থেকে নামতে পারে না কারো সাহায্য ছাড়া। একা একা দুই হাত সামনে প্রসারিত করে কোনো কিছু ধরে ধরে আন্দাজে পা ফেলে হাঁটতে গিয়ে কতবার যে পড়ে ব্যথা পেয়ে কুঁকিয়ে উঠেছে। তবুও নতুন একটা চশমা কিনে দিতে বলেনি আমাকে।


আমি বিদীর্ণ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। আমার চোখ দিয়ে অশ্র“ বেরিয়ে আসতে চাইলেও আমি তা গোপন করে বাবাকে ডাকি, ‘বাবা? ও বাবা?’
‘হুম।’ অস্ফুটে আমার ডাকে সাড়া দেয় বাবা।
আমি ধীর গলায় বলি, ‘আপনার চশমা ভেঙে গেছে আমাকে আগে বলেননি কেন?’
‘চশমা কিনতে টাকা লাগবে না!’ বাবার সহজ স্বীকারোক্তি।


একটা নতুন চশমা কিনতে যে টাকা লাগে, আমার মনে না থাকলেও বাবা কথাটি ভোলে না। তাই টাকা অপচয় হবে বলে অথবা অল্প টাকা বেতন পাওয়া তার স্কুলমাস্টার ছেলের হিসাব করা টাকা খরচ করতে চায়নি বলেই হয়তো বাবা আমাকে বলেনি।


আমাদের বৃহৎ পরিবারে বাবা ছিল একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কখনো পরিবারের লোকগুলোর ওপরে অর্থহীনতার ছায়াটুকু পড়তে দেয়নি। বাবার সব উপার্জন, সব আয়োজন এবং সব আশা-ভরসা আমাকে আশ্রয় করেই জন্ম নিয়েছিল! অথচ আমি এখন বাবার জন্য একটা চশমা কিনতে পারি না। একটা চশমা কিনতে কত টাকা লাগে?


মা আমাকে বলে, ‘তোর বাবাকে একটা চশমা এনে দিতে পারিস না? কোন দিন দেখবি এভাবে পড়ে গিয়ে মরে আছে।’


অন্ধ বাবার জন্য একটা নতুন চশমা কেনার টাকা নেই, এমন সন্তান বেঁচে থাকার কী প্রয়োজন থাকতে পারে? জ্ঞান হওয়ার পর যখন আমার বয়স দশ কিংবা পনের তখন দেখতাম রাত্রিশেষে ঘুম ভাঙলে সূর্যোদয়ের আগেই ফসলের মাঠে কাজ করতে বের হয়ে যেত আমার কৃষক বাবা। কাজের চাপে পান্তাভাত আর কাঁচা মরিচসমেত সকালের নাশতা দুপুরে আর দুপুরের খাবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হলে খেত। সঠিক সময়ে খাওয়ার অবকাশ পেত না। অবশ্য অবকাশ বলে কোনো শব্দ বাবার অভিধানে ছিল না। তারপর কর্ম-ক্লান্ত হয়ে দিনান্তে বাড়ি ফিরে এলে মা যখন খেতে দিত তখন ফাতেমা আর আমাকে ডেকে পাশে বসিয়ে খাওয়াতে ভুল হতো না কোনো দিন। ফাতেমা আর আমি পিঠেপিঠি ভাই-বোন। রাতে খাবার শেষে বাবা পান খেত। হাকিমপুরী জর্দার সুগন্ধি ছড়ানো সেই পান মুখে দেয়ার আগে ফাতেমা কান্না জুড়ে দিত। বাধ্য হয়েই বাবা মুখ থেকে বের করে একটু পান দিত তার মুখে। বাবার মুখ থেকে ওভাবে কখনো পান খাওয়া হয়নি আমার। ফাতেমা কেন খায়? একটুখানি ঈর্ষান্বিত হয়ে একবার বাবার মুখ থেকে পান খেয়েছিলাম। কিন্তু সাদাপাতা মসলার তেজে মাথা ঘুরে গিয়েছিল আমার। এর পর আর ভুলেও পান খাইনি।


‘তোমরা পেলে কী? কেবল নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত! নিজের বউ-বাচ্চার জন্য তো হাজার হাজার টাকা বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করো না। দয়া করে আমার দিকে একটু তাকাও। আমার জন্য একটা চশমা কিনতে তোমাদের টাকা থাকে না!’ বাবার উচিত এখন এই ধরনের কথা আমাকে বলে রাগ দেখানো।


কিন্তু বাবা তা করে না। বাবাকে এ জীবনে কখনো রাগ করে সামান্য উঁচু গলায় কথা বলতে দেখিনি। না মায়ের সাথে না আমাদের কারো সাথে। বাবার এই রাগ না করার পেছনে অনেক রাগ সঞ্চিত হয়ে আছে বলে মনে হয় আমার। বরং বাবার এই রাগ না করা, কাউকে বিশেষ করে আমাকে কিছু না বলার কারণে আমার অনেক দীনতা, অনেক নির্লজ্জতা প্রকাশ পেয়েছে। সেদিন আমার স্ত্রীর জন্য যে গয়নাগুলো কিনে এনেছি, আমার দুই বছর বয়সী বাচ্চার জন্য যেসব খেলনা এনে ঘর ভরেছি, আমার স্মার্ট ফোনটাতে ইন্টারনেট সংযোগে ফেইসবুক, ইমু, ভাইবার, হোয়াটসআপ, ট্যাঙ্গো আর ইউটিউবে দেশী-বিদেশী নানা রকম ভিডিও দেখার জন্য প্রতিদিন যে মেগাবাইট, গিগাবাইট খরচ হয়, একটি চশমা কিনতে কি এর চেয়ে বেশি টাকা খরচ হবে? অথচ একটা চশামার অভাবে বাবা সারাক্ষণ বিছানায় বসে কাটিয়ে দেয়। রাতে বিছনা থেকে নেমে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে মাকে বলে, ‘জানো হাসুর মা, যখন সব কিছু অন্ধকার থাকে তখন আর চোখের অন্ধত্বে সমস্যা নেই। হাঁটতে পারি ইচ্ছা মতো।’


আমি কর্মস্থলের দিকে পা বাড়াই আর মনে মনে ভাবি, আজ বাবার জন্য একটি চশমা কিনে আনবই।

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com