লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৪৭৪ বার
রবি ঠাকুরের নিখিল জগৎ
রাজু আলাউদ্দিন
শনিবার,  ৬ আগস্ট ২০১৬

বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এই বাঙালি মহান লেখকের সঙ্গে আমার সত্যিকারের পরিচয় ঘটে প্রবাসে। তার মানে কি এই যে আমি দেশে থাকতে তাঁকে পড়িনি? পড়েছি, কিন্তু সেই পাঠ তাঁর সত্যিকারের পরিমাপটি বুঝতে কোনো সহায়তা করেছে বলে মনে হয় না। তাঁকে ভালো করে পাঠ ও উপলব্ধি করার আগেই চলে গিয়েছিলাম বিদেশে। বিদেশের অবাঙালি নির্জনতায় আমি ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে শুরু করি তাঁকে নিজের সংস্কৃতির স্মৃতিকাতরতার সূত্রে। এর সঙ্গে আরেকটি ঘটনাও জড়িত হয়েছে বলে মনে হয়, সেটা হলো লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রচর্চার নমুনা। এই দুইকে একসঙ্গে আবিষ্কারের কারণে রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে ভিন্ন এক পরিপ্রেক্ষিতে হাজির হন। ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত বলতে আমার বক্তব্য হচ্ছে এই যে নিজের সংস্কৃতির এক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের প্রতি একটা প্রীতি তো নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু লাতিন আমেরিকার লেখকরা তাঁকে কিভাবে গ্রহণ করছেন, সেটা আমি দেখার চেষ্টা করেছি সেখানকার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে। তিনি যেই সময়ের রুচি ও সামাজিক পটভূমি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা আমাদের এই সময় থেকে বেশ খানিকটা দূরে। একজন বড় শিল্পী এই দূরত্বকে কিভাবে অতিক্রম করেন, সেটাই হচ্ছে বড় ব্যাপার। তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ প্রভাতসংগীত-এ তিনি হাজির হয়েছিলেন ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ নামক এক দুর্নিবার কবিতা নিয়ে, যা বাংলা কবিতার ধীরস্থির প্রবাহকে হঠাৎ তরঙ্গায়িত করে তুলেছিলেন, অস্ফুট আত্মাকে করে তুলেছিলেন মুখর ও আলোকোজ্জ্বল। উচ্ছ্বাসের মধ্যেই ধ্বনিত হয়ে উঠেছিল সৃষ্টির প্রাচুর্যে বলীয়ান, বৈচিত্র ও সুদূরের পিয়াসী রবীন্দ্রনাথের প্রবল অব্যর্থ উক্তিগুলো:

‘এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে–প্রাণ হয়ে আছে ভোর।’


আর কী আশ্চর্য, এই প্রথম গ্রন্থেই রবীন্দ্রনাথ একদিকে তাঁর আত্মার উদ্বোধনের কথা যেমন জানান দিচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এও জানালেন যে জগতের অন্য সব প্রান্তরের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগের কথাও:
‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,
জগৎ আসি সেথা করিছে কোলাকুলি।’


তাঁর লক্ষ্য ও বিস্তারের কথা সূচনাতেই আভাসিত হয়ে গিয়েছিল নির্ভুলভাবে। বহুকাল পর তাঁর উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থে মর্মরিত হয়ে উঠল সেই সুদূরের টান, জগতের সঙ্গে তাঁর প্রারম্ভিক বন্ধনের কথা :
‘বিশাল বিশ্বে চারিদিক হতে প্রতি কণা মোরে টানিছে।
আমার দুয়ারে নিখিল জগৎ শতকোটি কর হানিছে।’


রবীন্দ্রনাথের আগে আর কোনো বাঙালি কবির কণ্ঠে এই নিখিল জগতের সমূহতা আর বিপুলতাকে ধ্বনিত হয়ে উঠতে দেখিনি আমরা। এক অর্থে রবীন্দ্রনাথ যেমন আমাদের আত্মার বিপুলতাকে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছেন, অন্যদিকে এই আত্মাকে বিশ্বমুখী করে তুললে বিপুল বিস্তারের সৌন্দর্যে কতটা বর্ণিল হয়ে উঠতে পারে তারও অসামান্য চিত্র তিনি তুলে ধরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই বিশ্বসংস্কৃতির এক সুষম রূপের উদ্বোধন ঘটেছিল, আবার রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই বাংলার সৃষ্টিশীল মনীষা বিশ্ববোধের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। আমাদের চৈতন্যকে তিনি স্থানিকতার শৃঙ্খল থেকে কিভাবে মুক্ত করেছিলেন তার এক অসাধারণ নজির রয়েছে এই উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রবাসী’ কবিতাটিতেই। আমার প্রবাসজীবনের একাকিত্ববোধকে কিভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল এই কবিতাটি, তার একটু নমুনা এখানে তুলে দিচ্ছি:
‘জগতের যত অণু রেণু সব
আপনার মাঝে অচল নীরব
বহিছে একটি চিরগৌরব–এ কথা না যদি শিখিলে
জীবনে মরণে ভয়ে ভয়ে তবে প্রবাসী ফিরিবে নিখিলে।’


রবীন্দ্রনাথ কিভাবে আমার প্রবাসী জীবনের ‘প্রবাসী’ হওয়ার বিচ্ছিন্নতাবোধ বিলুপ্ত করে দিচ্ছেন, তা এতটা গভীরভাবে জানার সুযোগ হতো কি না জানি না। পরাধীন ভারতবর্ষে যে সময়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা দানা বাঁধতে শুরু করেছে, তখন তিনি এই ধরনের কবিতা লিখছেন। কবিতায় তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিপক্ষে ছিলেন না কখনোই, তবে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের কঠোর সমালোচক ছিলেন ঠিকই। যার চেতনা বিশ্ববোধে উদ্বুদ্ধ তিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে না উঠে পারবেন কেন? ওই প্রবাসজীবনেই একটি ছোট্ট কবিতার মমতাময়ী স্পর্শে প্রাণ ভোর হয়ে জেগে উঠেছিল একাকিত্বের অন্ধকার থেকে:
‘বিদেশে অচেনা ফুল পথিক কবিরে ডেকে কহে :
যে দেশ আমার কবি, সেই দেশ তোমারো কি নহে?’


দান্তে তাঁর কোম্মেদিয়ার নামপত্রে লিখেছিলেন ‘দান্তে আলিঘিয়েরির কোম্মেদিয়া, যে জন্মসূত্রে ফ্লরেন্সীয় কিন্তু চরিত্রে নয়।’ সব মহৎ শিল্পীই চরিত্রে তাঁর গোত্র ও সংস্কৃতির চেয়ে ভিন্ন কিছু। রবীন্দ্রনাথও ছিলেন তাই।
বিডিনিউজ

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com