লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৩১ বার
সদর আলী’র “দাদাভাই”
সাজ্জাদ আলী
শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৭

উচ্চস্বরের ফোনালাপে সাত সকালেই কাঁচা ঘুমটি ভেঙ্গে গেল। ১৯৯৮ সালের গ্রীস্মকালের কথা বলছি। কানাডায় সেটিই আমার প্রথম সকাল। গভীর রাতে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক থেকে সড়ক পথে টরন্টো এসে পৌঁছেছি। ট্রাক থেকে মালপত্তর নামিয়ে আহারাদি সেরে বিছানায় যেতে যেতে রাত সাড়ে তিন/চারটা বেজেছিলো। ঘুমটা মাত্রই যখন জেঁকে বসেছে, ঠিক সেই সময়েই পাশের ঘর থেকে ভেসে এলো কর্কশ কন্ঠস্বরটি, “হ্যালো শুনতি পাইতাছোস”? অসময়ে একি যন্ত্রণা! হা শুনতে পেয়েছি বটে! আর কেউ শুনুক বা না শুনুক, আমি শুনেছি! নিদ্রা দেবী তো দৌঁড়ে পালালো। আর একবার যখন নাখোশ হয়েছেন, দেবীতো সারা দিনে আর খোশ হবেন না! অগত্যা, বিছানায় শুয়ে শুয়েই কান খাড়া করে ঐ ফোন-সংলাপ শুনছিলাম।


“এইখানে সব গাড়িরই বাম হাতি স্টায়ারিং, ডান হাতি ওইলে তগোরে লাইগ্যা দু-একখানা ফাডাইয়া দিতাম,” “রাস্তাঘাটে কোন ছাতাবালাই নাই সব ছাপছুপ, কেউ হরেন বাজায় না, রাস্তায় জ্যাম নাই এক্কেবারেই”, -এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছেন ফোনালাপকারী। খানিকক্ষণ চুপ থেকে অন্য প্রান্তের কথা কিছু শুনে নিলেন, আবার বলা শুরু হলো,-। “ফানির দামে গাড়ি পাওন যায় এই দ্যাশে, আমার খানতিনেক আছে। যখন যে খানা ভাল লাগে লইয়া বাইর হই”। আবারও ফোনের অন্য প্রান্তের কথা কিছুক্ষণ শুনে জবাবে বললেন, “লাগে লাগে একলা মাইনষেরও তিনখানা গাড়ি লাগে, ও তুই বুঝবি না! সোনার দ্যাশ কানাডা,....! এভাবে আরো অন্তত মিনিট বিশেক চললো তার ফোনালাপ!



ফোনের কথক নিয়াজ আহমেদ মজুমদার তখনও আমার অপরিচিত। ইমিগ্রেশন নিয়ে গত রাতেই আমেরিকা থেকে টরন্টো এসে পৌঁছেছি। কানাডা’র হালহকিকত কিছুই জানা নাই। ডাউন টাউনের একটি সুউচ্চ ভবনের একেবারে নিচ তলার দুই কক্ষের একটি এপার্টমেন্টের ছোট কক্ষটির উপ-ভাড়াটে আমি। হক সাহেব, বাসাটির মূল ভাড়াটে। সজ্জন এবং গোঁড়া ধার্মিক প্রকৃতির লোক তিনি। নিজে থাকেন বড় কক্ষটিতে। বসবার ঘরটি সাইজে বেশ বড়, কিন্তু বসার কোন ব্যবস্থা নেই। সেখানে তিনখানা খাট পেতে হক সাহেব তিন জনকে ভাড়া দিয়েছেন। আমি সহ এপার্টমেন্টের অধিবাসীর সংখ্যা সাকুল্যে পাঁচে দাঁড়ালো।


সেদিন রবিবার, গৃহসঙ্গীরা সকলেই গৃহে। হক সাহেব আমাকে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। সকলেই ছুটির মেজাজে আছেন। পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি, নিজ নিজ বিছানায় উপবিষ্ট ওরা। একথা সেকথার ফাঁকে জানা গেল ওরা কেউই সরাসরি বাংলাদেশ থেকে কানাডা আসেন নি। একজন আফ্রিকার ছোট্ট কোন একটি দেশে ক’বছর কাটিয়ে এসেছেন, বাকিরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। আমি আমেরিকা থাকতাম শুনে ওরা নানা রকম কৌতূহলী প্রশ্ন করছিলো। তবে সবারই একটা কমন প্রশ্ন ছিলো, আমেরিকার সিটিজেনশিপ পাওয়া যায় কিভাবে? বললাম, সেটা খুব সহজলভ্য হলে তো আজ কানাডায় আপনাদের সাথে দেখা হতো না!


এক পর্যায়ে আমিও কৌতূহল বসে জানতে চাইলাম, কিছুক্ষণ আগে আপনাদের মধ্যে “গাড়ি নিয়ে” কে ফোনে কথা বলছিলেন? ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসা ভদ্রলোক বললেন, জ্বে আমি, আমার নাম মজুমদার। হক সাহেব মজুমদারের পরিচয় খানিকটা সম্প্রসারিত করে বললেন, উনি একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, সৌদি আরবে ১৪ বছর চাকুরি করে বছর দেড়েক হলো কানাডা এসেছেন।


এই ক’ঘন্টার পরিচয়েই লক্ষ্য করেছি হক সাহেবের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের মতো এক ধরণের “গণ চরিত্র” আছে। সকলের মতকে সে ধারণ করতে পারে এবং স্বভাবেও খানিকটা অভিভাবক সুলভ ব্যাপার আছে। এবারে সে কাজে মন দিলো। গৃহসঙ্গীদের সবাইকে শুনিয়ে আমাকে বললো,- হয়েছে কি ভাই সাহেব, আমরা চারজন এক সাথে খাই। বাজারঘাট যে যা করি লিখে রাখি, মাস শেষে খাওয়া খরচ সমান চার ভাগে শেয়ার করি। রান্নার দায়িত্ব একেক দিন একেক জনের, যে দিন যে রান্না করে সে সবার জন্যেই করে। জানতে চাইছি, আপনি কি আমাদের সাথে খাবেন, নাকি আলাদা রান্নাবান্না করবেন?


তার এই কৌশলগত প্রশ্নটি দ্রুতই মনের মধ্যে ভাজিয়ে নিলাম। মন বললো সবার সাথে মিলেমিশে চলাটাই সৌজন্য। বললাম, থাকবো আপনাদের সাথে আর খাবো একা, তা কেন হবে? আপনাদের সাথেই খাবো। তবে এ বিষয়ে দুটো “অনুগ্রহ” চাইবার আছে! আমার রান্না খুব খারাপ, আপনারা তা খেতে পারবেন না। আর বাজার করায় আমি বরাবরই নবিশ; টাকা পয়সা বিস্তর খরচ করে ফেলি কিন্তু দরকারি পণ্যটি ঠিক চিনে কিনে উঠতে পারি না। আলুটা ভালো কিনি তো ধেড়স পঁচা অথবা হলুদের গুড়ি ঠিক কিনেছি তো কাঁচা মরিচে ঝাল নেই! আমি বাজারে গেলে আপনাদের টাকা-পয়সার শ্রাদ্ধ হবে! তো এই রান্না আর গ্রোসারি কেনাকাটা থেকে আমাকে যদি অব্যাহতি দেন তো বড়ই স্বস্তি পাবো।


আমার এ কথায় ওদের মুখে অস্বস্তির ছাপ লক্ষ্য করলাম। প্রত্যেকের মুখাবয়বই যেন আমাকে বলছে, “রান্না করবো আমরা আর আপনি বসে বসে খাবেন”! তো গৃহসঙ্গী বলে কথা, যাদের সাথে থাকতে হবে তাদের তো ছোটখাট কারণে নাখোশ রাখা ঠিক নয়। বললাম, এই “রান্না আর গ্রোসারি” করার উপদ্রব থেকে দুরে থাকতে পারার বিনিময়ে আমি সংগত অংকের অর্থ দন্ড দিতে রাজি আছি। এ কথায় সবার মুখখানাই যেন প্রসন্ন হলো! একজন আগ বাড়িয়ে বললেন, ভাই সাহেবের ভাগের রান্নাটা আমিই তাহলে করে দেবো! হক সাহেব তাড়া দিয়ে বললেন, চলুনতো ভাই আপনাকে গাড়ি পার্ক করার জায়গাটা দেখিয়ে দি।


পার্কিং লটে হক সাহেবের এপার্টমেন্টের জন্য পাশাপাশি দুটো পার্কিং স্পেস বরাদ্দ রয়েছে। স্পেস দুটো স্বাভাবিকের থেকে অনেকটাই বড়। আর ওগুলো পাশাপাশি হওয়ায় অনায়াসেই দুটো স্পেসে তিনটে গাড়ি পার্ক করা চলে। সেখানে তখন তিনটি গাড়িই পার্ক করা দেখলাম। হক বললো, এগুলো মজুমদারের গাড়ি। তাকে বলেছি, সে আজই আপনার জন্য একটা স্পেস ফাঁকা করে দেবে। স্মরণে এলো, হা তাইতো মজুমদার তিন তিনটে গাড়ির কথাই তার ফোনালাপে বলছিলো বটে।


কিন্তু গাড়িগুলোর একি হাল! একটিওতো চালানোর উপযুক্ত না! একখানার হুড নেই, ইঞ্জিন খোলা, আরেকখানার সামনের পেছনের কোন চাকাই নেই,  অপরখানাও দেখছি ভাঙ্গাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে, পেছনের সিটগুলো নেই! হক সাহেব বলে উঠলো, এগুলো সবই জাঙ্ক গাড়ি, রাস্তা থেকে  কুড়িয়ে এনেছে। মজুমদার মেকানিক্যাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, পার্টস-টার্সসের ব্যাপার-স্যাপারগুলো সে বোঝে। নাটবল্টু খুলে খুলে বিক্রি করে। মনে মনে বললাম, মজুমদার তাহলে মিথ্যার কবি! সুন্দর করে গুছিয়ে বাংলাদেশের স্বজনদের কাছে মিথ্যা গাড়ি-কাব্য বলছিলো আজ সকালে!


কথিত এই মেস-গৃহে আমি সাড়ে পাঁচ মাস ছিলাম। এই সময়টিতে বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়েছি। ক’দিনের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম ওরা কেউই কর্ম দিবসগুলোতেও কাজে যান না। সারাদিনই বাসায় শুয়ে বসে কাটান। দুজনকে দেখি দিনজুড়েই “মোকসেদুল মোমেনিন” গোছের ধর্ম শিক্ষামূলক বইয়ের পাতা উল্টাতে থাকেন। ঘরের মধ্যেই জামাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। একজনতো সারাদিনই জায়নামাজে আসীন থাকেন। তার সুন্নত/ওয়াজেব নামাজ আর শেষ হয় না! ওদের হাভভাব দেখে মনে হয় যেন অন্য কোন কাজকর্ম নেই, ধর্মাচার পালন করতে ওরা কোন তীর্থে এসেছেন। আর তীর্থস্থানের পুরোহিত (কানাডা সরকার) ওদের ভরণ পোষণ করছেন!


সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে দুটো চাকরি জুটিয়ে ফেলেছি, দুটোই খ-কালীন কাজ। শনি ও রবিবার একটি তিন তারকা খচিত আবাসিক হোটেলের রাতের শিফটের রিসেপশনিষ্ট আর মঙ্গল ও বুধবার ঐ হোটেলের অভ্যন্তরস্থ একটি ফাইন ডাইনিং রেষ্টুরেন্টের ওয়েটারের কাজ। সপ্তাহের বাকি তিন দিনের বেকারত্ব খুব অসহ্য ঠেকছিলো। মাস খানেকের মধ্যে টরন্টোর মিউজিয়াম এবং দর্শনীয় স্থানগুলো মোটামুটি দেখা হয়ে গেল। একদিন থিয়েটার পাড়াও ঘুরে এসেছি। নিউ ইয়র্কের ব্রডওয়ে থিয়েটারগুলোর তুলনায় এখানকার থিয়েটারের মান বেশ মলিন মনে হয়েছে।


গৃহসঙ্গীদের মধ্যে সদর আলী সব থেকে বয়োকনিষ্ঠ এবং বোকাসোকা প্রকৃতির। আমাকে প্রথম দিন থেকেই সে কেন জানি না “দাদাভাই” বলে ডাকে। কথাবার্তা শুনে মনে হয় না খুব বেশি দুর পাশ দিয়েছে। সারল্যে ভরা মুখ খানা তার, খুব মায়া কাড়া চেহারা। বাসার অন্য সবাই তার উপরে সারাক্ষণ খবরদারি করে। নিজের ন্যায্য অধিকার বলবৎ রাখবার শক্তিটুকুও বিধাতা ওকে দেননি! প্রথম দর্শনেই খুব মায়া পড়েছে ওর উপর, কিন্তু প্রসঙ্গ আসেনি বলে তা প্রকাশ করিনি। সরলতার সুযোগ নিয়ে বাসার সবাই ছেলেটাকে অশোভনভাবে খুব খাটায়!


একটি নমুনা বলি,-। মজুমদার চা খাবে, রান্নাঘরে যেয়ে দেখে চায়ের পাতা নেই। হাকডাক জুড়ে দিলো, সদর আলী, ও সদর আলী! ভাই যাওতো এক দৌঁড়ে চায়ের পাতা কিনে নিয়ে আসোতো! সদর আলী দিবা নিদ্রায় ছিলো। হুড়মুড় করে উঠে গায়ে জামা চড়ালো, চা-পাতা কিনতে যেতে হবে তাকে! মেসের অন্য সদস্যরা সবাই নির্বিকার! এটাইতো স্বাভাবিক! চায়ের পাতা নেই বা পেঁয়াজ ফুরিয়ে গেছে, -তো সদর আলী দৌঁড়ে গিয়ে নিয়ে আসবে; এমনটাইতো রীতি। এ আর নতুন কি!


কিন্তু আমার কাছেতো ব্যাপারটি খুবই নতুন! এ দৌরাত্ম্যতো ঘটতে দিতে পারি না! নিজ কক্ষের মধ্যে বসেই সকলকে শুনিয়ে চেঁচিয়ে বললাম, সদর তুমি কি বাইরে কোথাও যাচ্ছো? হাঁ দাদাভাই চায়ের পাতা ফুরিয়ে গেছে, আনতে যাচ্ছি। আপনার কিছু লাগবে? ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তুমি কি ভর দুপুরে চা খাও? দাদাভাই আমি চা খাই না, মজুমদার ভাই খাবে, -কাতর কন্ঠে জবাব দিলো সদর। শক্ত গলায় বললাম, তার চা খাওয়া নিয়ে তোমার দৌঁড়ঝাপ কেন? তুমি গায়ের জামা খুলে আবার ঘুমুনোর চেষ্টা করোগে, যাও। মজুমদারের চা-পাতা আজ আমি এনে দিচ্ছি!


কন্ঠস্বর কঠিনতর করে বললাম, মজুমদার সাহেব টাকা দিন; আর কোন ব্রান্ডের চা খাবেন একটা কাগজে তা শুদ্ধ করে লিখে দিন। দেখবেন বানান যেন ভুল না হয়! ঝানু মাল মজুমদার, বাতাস আঁচ করতে পেরেছে! পরিস্থিতির চাপে ততক্ষণে তার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা! অন্য গৃহসঙ্গীরাও তাদের অলসতা ঝেড়ে ফেলে ক্ষণিকের জন্য আমার “চা-পাতা কিনতে যাওয়া” নাট্যাংশের দিকে কান খাঁড়া করে রইলো। অবনতিশীল পরিস্থিতির আশঙ্কায় সদর আলী ভয়ার্ত কন্ঠে আমার দরজার কাছে এসে মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু হয়ে বললো, দাদাভাই অসুবিধা নাই আমিইতো সব দিন দৌঁড়ে গিয়ে টুকটাক সব কিছু কিনে নিয়ে আসি! আজ আপনি যাবেন কেন?


ওকে ধমকে দিয়ে বললাম, তুই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়গে যা! লেবেন্ডিস কোথাকার! আজ আমিই ওনার চা-পাতা কিনতে যাবো। কই মজুমদার সাহেব কাগজে লিখেছেন, কি চা খাবেন? মজুমদার মিনমিনে গলায় বললো, থাক আফনের যাওনের কাম নাই; আমি বৈকালে যখন বাইরে যামুনে তখন পাতা কিনা আনুমনে। হা সেটা মন্দ না, আপনি তা করতেই পারেন, -বললাম আমি। দোকানে বানানো চাও বিক্রি হয়, ইচ্ছা করলে ওখানে বসে খেয়েও আসতে পারেন। মজুমদার শুধু বললো, জ্বে আচ্ছা! অতপর: মাস্তানি কায়দায় মুখের চোয়াল শক্ত করে ডান হাতের তর্জনী মজুমদারের দিকে তাঁক করে বললাম, এই মেসে যতদিন আমি আছি, চা-পানি একটু বুঝেসুঝে খাবেন, বুঝলেন! এ নাট্যদৃশ্য মঞ্চায়নে হক সাহেব বেজায় খুশি! আমার সুরে সুর মিলিয়ে বলে উঠলেন, এখন থেকে সবাই মনে রাখবেন কিন্তু ব্যাপারটা, ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।


বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সদর আলী ওর বিছানায় বসে নি:শব্দে অঝোর ধারায় কাঁদছে। ওর প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন লজ্জা, অপমান আর অসহায়ত্বের প্রতীক! ক’কদম এগিয়ে ওর পাশে বসে মাথাটা কাছে টেনে নিয়ে হাত বুলাতে থাকলাম। এবার ওর কান্নার বেগ আরো বাড়লো। কাঁদছে আর বলছে, দাদাভাই আমি আর বেকার ঘরে বসে সরকারি ভাতা খেতে চাই না, কাজ করতে চাই। কোথায় পাবো কাজ? কে দেবে আমাকে কাজ? কাউকে চিনি না আমি! ইংরেজি বলতে জানি না বলে নিজেও কাজ খুঁজে নিতে পারি না। দাদাভাই, কেউ আমাকে মানুষ মনে করে না, সবাই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে! ওর বাঁধ ভাঙ্গা কান্না থামানোটাই সে মুহুর্তে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো। ওকে আশ্বস্ত করে বললাম, তুমি কাজ করতে চাইলে ২/৪ দিনের মধ্যেই তোমার কাজের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এবার কান্না থামাও দিকি!


তবুও ডুকরে ডুকরে কাঁদছে ছেলেটি! স্বেচ্ছা বেকারত্ব ওকে নিত্য যন্ত্রণা দেয়। ঐ যন্ত্রণা থেকে বেরুনোর ইচ্ছা থাকলেও, সে ইচ্ছা বাস্তবায়নের স্বাভাবিক সামর্থটুকু তার নেই। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে হবে সদর! আল্লাহপাক ছাড়া কারো কাছে যেন মাথা নত না হয়, কেমন? টরন্টোতে আমি বেড়াতে আসিনি, স্থায়ীভাবে থাকবো বলে এসেছি। তুমিওতো থাকবে এখানেই। আমরা একে অন্যকে দেখে রাখবো ভাই, আর কেঁদো না!


পাঠক, আমার সদর আলী এখন ভাল আছে! নিজের ছোটখাট ব্যবসাটি নিজেই দেখাশুনা করে। এতগুলো বছর পরে দেখি সে আর আগের মত ততটা বোকাসোকা নেই! স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে অনেক ভালো আছে সে। আর আমাকে এখনও “দাদাভাই” বলেই মানে! 


লেখক বাংলা টেলিভিশন কানাডা’র নির্বাহী

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com