লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৭২ বার
লক্ষ্য হাসিলের জন্য যেকোনো পথই বৈধ!
মহিউদ্দিন আহমদ
বাংলারিপোর্টার.কম
রবিবার, ১৮ জুন ২০১৭

দেশের হাল-হকিকত কেমন? কেউ বলবেন, আমরা উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছি। আবার কেউ বলবেন, দেশ রসাতলে যাচ্ছে। সবাই সব বিষয়ে একমত হবেন, এটা ভাবা যায় না। কোনোকালেই ‘এক মত এক পথ’ বলে কিছু ছিল না। এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে দুকথা বলার আগে ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানো যাক।


আমরা গণতন্ত্রের সবক নিয়েছি ইংরেজদের কাছ থেকে। ব্রিটিশ ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্রের একটা অবয়ব এ দেশে কয়েক বছর চালু ছিল। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপতি জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান একটা ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ ঘটালেন ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর। স্কুলের বইয়ে এটাকেই বলা হতো ‘অক্টোবর বিপ্লব’। ওই রকম একটা বিপ্লব যে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ঘটেছিল, তখন সেটা জানতাম না। তো বিপ্লব ঘটিয়েই আইয়ুব খান দুটো কাজ করলেন। এক. তিনি দেশি গণতন্ত্র চালুর চিন্তা করলেন এবং দুই. তিনি সংসদীয় ব্যবস্থা হিমঘরে পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন চালু করলেন।


১৯৬১ সালের কথা। আইয়ুব খান নতুন একটা সংবিধান তৈরির আয়োজন করছিলেন। ওই সময় তাঁর সঙ্গে অনেক রাজনীতিবিদের কথাবার্তা এবং সলাপরামর্শ হয়েছিল। তাঁদের একজন ছিলেন মৌলভি তমিজুদ্দিন খান। তমিজুদ্দিন খান পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। আইয়ুব খানের সঙ্গে তিনি কথা বলার সময় কোনো রাখঢাক করেননি। আইয়ুব খান তাঁর আত্মজীবনীমূলক ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স বইয়ে দুজনের মধ্যকার সংলাপ উদ্ধৃত করেছেন এভাবে:


আইয়ুব: আপনার আপত্তিটা কোথায়?


তমিজ: মুসলিম ইতিহাস এবং আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সব সময় এক ব্যক্তির শাসন দেখেছি। আমার ভয় হয়, পাছে আমরা ওই অবস্থায় ফিরে যাই, যদিও আমরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পেয়েছি।


আইয়ুব: যদি এটা মুসলমানদের রক্তের মধ্যেই থাকে, কীভাবে এ থেকে বেরিয়ে আসবেন? আপনি কি একজন একনায়ক এবং একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মধ্যে পার্থক্য দেখেন না? যুক্তরাষ্ট্রে কি প্রেসিডেন্ট নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র কি গণতান্ত্রিক নয়? আপনি কেমন করে গণতন্ত্রের পক্ষে বলেন, যেখানে মুসলিম লীগ ছাড়া দশ-পনেরোটা রাজনৈতিক দলের কোনোটারই জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি নেই?


তমিজ: শুধু দুটো দল থাকবে এমন একটা আইন আমরা করতে পারি।


আইয়ুব: তমিজুদ্দিন সাহেব, আইন করে যদি মানুষের বিবেক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে সব মুসলমানকে এক গোত্রে নিয়ে আসেন না কেন? মুসলমানদের মধ্যে ৭২টা ফেরকা আছে, যদিও সবাই কোরআন থেকে প্রেরণা খোঁজে। আইনের কৌশল নিয়ে মানুষের বিবেক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।


তমিজ: তবু আমি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চাই।


তমিজুদ্দিন খান নিজের মতে অটল থাকতে পারেননি। আইয়ুব খানের দেওয়া ১৯৬২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হলো এবং তমিজুদ্দিন খান আইয়ুবের সমর্থন নিয়ে জাতীয় পরিষদের স্পিকার নিযুক্ত হলেন।


আইয়ুব খানের সাড়ে দশ বছরের শাসনামলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গুরুতর আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল এবং তথাকথিত জাতীয় সংহতির ওপর থেকে বাঙালিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সে আরেক ইতিহাস। কিন্তু আইয়ুব খানের দুটি কথা আমার কাছে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। প্রথমত তিনি বলেছেন, মুসলমানের রক্তেই আছে একনায়কতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, মুসলমানদের মধ্যে ৭২টি ফেরকা। এরা পরস্পরকে শুধু গালাগাল করে না, সামান্য কারণে একে অপরের বিরুদ্ধে তলোয়ার-বন্দুক তাক করতে দ্বিধা করে না। মুসলমানদের মধ্যে গোষ্ঠীগত দাঙ্গায় পাকিস্তান এখন ক্ষতবিক্ষত। প্রতিনিয়ত দাঙ্গার শিকার হচ্ছে মানুষ, নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশু। সবই হচ্ছে ইসলামের নামে।


পাকিস্তান ভেঙে আমরা স্বাধীন হয়েছি ঠিকই, কিন্তু পাকিস্তানি ধারার আইডেনটিটি পলিটিকস থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। এ দেশে এখন ইসলামের নামে কত যে দল-উপদল, কত যে গোষ্ঠী, তার লেখাজোখা নেই। ৭২টা ফেরকার নাম আমি জানি না। তবে অবস্থা দেখে মনে হয়, সংখ্যাটা কম হবে না।


আমাদের দেশের জন্মলগ্ন থেকেই গণতন্ত্রের লেবাসে এক ব্যক্তির শাসন চলে আসছে। এ দেশের মানুষ সম্ভবত প্রথমবার গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিল ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে, যখন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ৯০ দিনের জন্য প্রশাসনের হাল ধরেছিলেন। তারপর যথা পূর্বং তথা পরং। টিভি চ্যানেলে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুনছিলাম। এক সাবেক মন্ত্রী বলছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের এলাকায় একটি মেডিকেল কলেজ দিয়েছেন।’ এ দেশে কলেজ, স্কুল, রাস্তা, কালভার্ট, রিলিফের টিন-বিস্কুট সবই দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনিই সরকার। তিনিই সার্বভৌম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের টেক্সট বইয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের কোনো সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা আছে কি না, জানি না।


আইয়ুব খান তাঁর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। তবে ইসলাম-পসন্দ দলগুলোকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেননি। জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মওদুদীসহ তাঁদের অনেক নেতাকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। আইয়ুব খানকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে হারানোর লক্ষ্যে বিরোধী দলগুলো কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ) তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সঙ্গে তখন একই ছাতার তলায় জুটেছিল জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ। জামায়াতের দাবির মুখে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ তাদের কর্মসূচিতে বলেছিল, ফাতেমা জিন্নাহ জিতলে তারা আইয়ুব খানের জারি করা ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১’ সংশোধন করবে। এই অধ্যাদেশ ছিল এ–যাবৎকালের মধ্যে এই অঞ্চলে তৈরি হওয়া সবচেয়ে প্রগতিশীল আইন। কিন্তু জোটের রাজনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো কতই-না আপস করে এবং ডিগবাজি খায়!


ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এ দেশের রাজনীতিবিদেরা একসময় সহাবস্থানের পথ বেছে নিয়েছিলেন। এখন তাঁদের রীতিমতো অন্দরমহলে ঢুকিয়ে ইনক্লুসিড পলিটিকসের পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে।


১৯৭২ সালে মনে হয়েছিল, পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি বোধ হয় এ দেশে আর কলকে পাবে না। জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য ১৯৭৩ সালের নভেম্বরে প্রায় ৩০ হাজার ইসলাম-পসন্দ লোককে সাধারণ ক্ষমায় ছেড়ে দিয়ে বামপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দিয়ে জেলখানা ভরে ফেলা হয়েছিল। তারপর থেকে সেক্যুলারপন্থীদের ক্রমাগত পশ্চাদপসরণ চলছে। পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানের পর ধর্মীয় জিগিরের পালে বাতাস দেওয়ার আয়োজন বেড়ে গেল কয়েক গুণ। এখন ‘মুসলমানের ভোটব্যাংক’ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন সবাই। তার সবশেষ উদাহরণ হলো ‘হেফাজতে ইসলাম’।


দেশে এখন ‘স্বাধীনতার চেতনাপন্থী’ আর ‘হেফাজতপন্থী’দের মধ্যে জোর লড়াই শুরু হয়েছে। সরকার এটা বুঝে গেছে যে, তার সমালোচক ‘চেতনাপন্থীরা’ সংখ্যায় বেশি না, তাদের পেছনে গণমাধ্যমের যতই সমর্থন থাকুক না কেন, আমজনতার তেমন আগ্রহ নেই। তাদের হাঁকডাক কেবল সেমিনার কক্ষে কিংবা টিএসসি থেকে শাহবাগের মোড় পর্যন্ত। হেফাজতপন্থীরা ক্রমেই প্রবল হচ্ছেন। তাঁরা সাধারণ মানুষের মনোজগতে সুড়সুড়ি দিতে সফল হয়েছেন। সরকার এই বাস্তবতা বোঝে।


স্কুলের পাঠ্যবইয়ে সম্প্রতি যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে দু-একজন লোকের কারসাজি বলার সুযোগ নেই। আয়োজনটি চলছিল অনেক দিন ধরেই। হজরত শাহজালালের (র.) মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচার শুরুর রেওয়াজ চালু হয়েছে অনেক বছর আগেই। এর শেষ কোথায়, জানি না। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের এখনকার হতশ্রী অবস্থা দেখে চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কীই-বা করার আছে।


ইউরোপীয় সাহিত্যে ফ্র্যাঙ্কেনস্টেইন বলে একটি চরিত্র আছে। আমরা ইউরোপ থেকে যেমন দেবী থেমিস এনেছি; তেমনি এনেছি গণতন্ত্র, ক্রিকেট ও ফ্র্যাঙ্কেনস্টেইন। ইউরোপের আরেকজনকে আমরা রাজনীতির মহাজন হিসেবে পূজা করি। তিনি হলেন ম্যাকিয়াভ্যালির দ্য প্রিন্স। ‘লক্ষ্য হাসিলের জন্য যেকোনো পথই বৈধ’, এই অমোঘ সত্য আমাদের রাজনীতিবিদেরা এখন সকাল-সন্ধ্যা জপ করেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের যে স্থূল রাজনীতি, সেখানে সুফি-দরবেশদের জায়গা নেই। আজমির শরিফ গিয়ে কেউ হয়তো খাজা বাবার দরবারে চাদর চড়াবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর জীবনাচরণ কিংবা দর্শনকে ভাবজগতে ঠাঁই দেবেন না। কারণ, রাজনীতিতে সুফিবাদের জায়গা নেই। এটা একটা যুদ্ধ। এখানে আছে নানান পক্ষ। জয়ের জন্য সবাই মরিয়া। নেতা তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে।


দেশটা ওপরে ওপরে ফুলেফেঁপে উঠেছে। চওড়া সড়ক, লম্বা সেতু, বিশাল বাজেট দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ভেতরে ঘুণ ধরেছে, ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আসবে, যখন প্রশ্ন উঠবে, তাহলে আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কেন? কেন লাখ লাখ মানুষ জীবন দিলেন, সম্ভ্রম হারালেন? কেন?প্রথম আলো


মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

মতামত এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com