লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৩০৪ বার
শান্তি কুটির

যুথিকা বড়ুয়া

বাংলারিপোর্টার.কম
বৃহস্পতিবার, ১০ আগষ্ট ২০১৭

দিব্যেন্দু আর মালবিকা, ওরা নিঃসন্তান। দুজনেই অর্থ উপার্জন করে। স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছোট্ট ছিমছাম নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার দিব্যেন্দুর। ও পেশায় একজন মেডিক্যাল ডাক্তার, চাইল্ড্ স্পেশালিষ্ট।  স্ত্রী মালবিকা নার্সারী স্কুলের শিক্ষয়িত্রী। শহরের নিরিবিলি রেসিডেন্সি এলাকায় শ্বেতপাথরের মোজাইক করা অট্টালিকার মতো বিশাল বাড়ি। বাড়ির সদর দরজার একটু উপরে নেইম প্লেটে বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা, “শান্তি কুটির।” কিন্তু তাদের মনের ঘরে বিগত এগারো বছর যাবৎ এতটুকু সুখ, শান্তি নেই বললেই চলে।


কর্মজীবনে মানব সেবাতেই দিব্যেন্দুর দিন যায় রাত পোহায়। দিনের শেষে ক্লান্ত সূর্য্য কখন অস্তাচলে ঢলে পড়ে, কখন সন্ধ্যে পেরিয়ে বাইরের পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে যায়, মালুমই হয়না। উদয়াস্ত রুগীর সেবা-শুশ্রূষা করতে করতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে একেবারে ভাটা পড়ে গিয়েছিল।


এবার ১৫তম বিবাহ বার্ষিকীতে দিব্যেন্দু মনস্থীর করে, প্রিয়তমা স্ত্রী মালবিকাকে সারপ্রাইজ দেবে। মনে মনে প্ল্যান করে, বাইরে দূরে কোথাও সস্ত্রীক বেড়াতে যাবে। সেই সঙ্গে সামার ভেকেশনও কাটিয়ে আসবে। রুটিনমাফিক একঘেঁয়ে কর্মজীবন থেকে কিছুদিনের জন্য বিরতি নিয়ে সমুদ্রসৈকতে যাবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, বৃদ্ধা মা রমলাদেবীকে নিয়ে। তিনি বাতের ব্যথায় কোথাও নড়তে পারেন না। সারাদিনে বেশীরভাগ সময় শুয়ে বসে কাটান। সকাল সন্ধ্যে দুইবেলা পালা করে লোক আসে ওনাকে মাসাজ করতে। ওনাকে দেখভাল করার জন্য একজন বিশ্বস্থ কাউকে দরকার। কিন্তু স্বেচ্ছায় দিব্যেন্দুর এতবড় একটা দায়িত্ব নেবে কে! তা’হলে?


শুনে দিব্যেন্দুর বাল্যবন্ধু ভাস্কর বলল, -“আরে এয়ার, ডোন্ট ওরি! ম্যায় হুঁ না!”


প্রভুভক্তের মতো আনুগত্য হয়ে মাথাটা ঝুঁকিয়ে বলে,-“বান্দা হাজির হ্যায় দোস্ত। বিপদের সময়ই বন্ধুর পরীক্ষা হয়। মাসিমাকে নিয়েই তোদের ভাবনা তো, নিশ্চিন্তে থাক্। ওনার দেখাশোনা আমিই করবো। তুই শুধু বাড়ির চাবিটা আমায় সঁপে দিয়ে যা, ব্যস কেল্লাফতে!” 


অপ্রত্যাশিত বন্ধুর আশ্বাস পেয়ে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে দিব্যেন্দু। চোখমুখ থেকেও ঝড়ে পড়ছে উচ্ছাস। হঠাৎ পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে নজরে পড়ে, আবেগের প্রবণতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখের তারাদুটি অশ্রুকণায় চিক্চিক্ করে উঠেছে মালবিকার। যেন কালো মেঘের আড়াল থেকে একফালি সূর্য্যরে রশ্মি উদ্ভাসিত হওয়ার মতো। হওয়াটাই স্বাভাবিক! চল্লিশের উর্দ্ধেঃ বয়স মালবিকার। জীবনের প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে এসেছে কিম্বা তার চেয়ে বেশী বা কম, কে বলতে পারে! জীবনে কিইবা পেয়েছে! কিছুই তো পায়নি। অর্থ-ঐশ্বর্য্যই কি সব! আর যাই হোক, পয়সা কড়ি দিয়ে কখনো মনের সুখ, শান্তি কেনা যায় না। সুখী হওয়া যায় না। হিসেব করলে দেখা যায়, যোগ-বিয়োগ দুই-ই শূন্য। কত স্বপ্ন ছিল জীবনে। কত আশা ছিল, কত সাধ-আহাল্লাদ ছিল। কিছুই পূরণ হয়নি। পূরণ করতে পারেনি মালবিকা। যেদিন প্রসবকালীন জটিলতার অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একটি মৃত কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পরই চিরদিনের মতো হারিয়ে যায়, সন্তান ধারণের ক্ষমতা। আর সেই থেকে নারীজাতির পরম আকাঙ্ক্ষিত মধুচন্দ্রিমার সেই আবেগে সোহাগে অনুরাগে আনন্দময় মধুর রজনী আর ফিরে আসেনি মালবিকার জীবনে। যেন একই পথের দুই মোসাফির। একই ছাদের নীচে বসবাস করেও দুজনার মন-মঞ্জিল ছিল দুইপ্রান্তে। এতকাল নার্সারী স্কুলের বাচ্চাদের হৃদয় নিঃসৃত স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা বিতরণে নিমজ্জিত হয়ে মালবিকা বেমালুম ভুলে ছিল, সন্তানহীনতার যন্ত্রণা, মাতৃত্বহীনতার যন্ত্রণা। পূরণ করতো মা হবার সাধ।


ভাগ্যবিড়ম্বণায় একবুক অভিমান নিয়ে বিগত দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্ত একেবারে নিরস, নিরুচ্ছাস, নিস্প্রেম, নিরানন্দে কেটেছে মালবিকার। যেখানে ইচ্ছা, আবেগ, অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনা কিছুই ছিলনা। অন্যদিকে দিব্যেন্দুও ইচ্ছাকৃতভাবে উদয়াস্থ রুগী সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রেখে দিন অতিবাহিত করতো। যখন ওর কোনো পিছুটানই ছিল না।


সূর্য্য আজ পশ্চিম দিকে উঠছে না কি! মন-মানসিকতার কি অদ্ভুদ বৈপরীত্য দিব্যেন্দুর! আচমকা এতখানি পরিবর্তন ওর! এ্যমাজিনই করা যায়না। পুরো উদ্যাম উদ্দীপণায় মন-প্রাণ ওর স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিনা নোটিশে দিব্যেন্দুর সমুদ্রসৈকতে যাবার পরিকল্পনায় ভাবনার সাগরে ডুবে গেলেও চকিতে মনের পূঞ্জীভূত সমস্ত গ্লানি, মান-অভিমান, অভিযোগ, নালিশ সব অপসারিত হয়ে চোখেমুখে খুশীর ঝিলিক দিয়ে ওঠে মালবিকার। মন-প্রাণও সতেজ সজীব হয়ে ওঠে। আবেগের প্রবণতায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো চোখদুটো আশ্রুকণাতে ছল্ছল্ করে উঠেছে। মনকেও বিকাশত করে। পুলক জেগে ওঠে। যেন শুস্ক মরুভূমির বুক একপশলা বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে চুপসে গেল।


নজর এড়ায় না দিব্যেন্দুর। সুদীর্ঘ এগারো বছর পর প্রিয়তমা মালবিকার ঠোঁটের কোণে তড়তাজা হাসির ঝিলিকটা ওকে আরো উদ্ধত করলো, উৎসাহিত করলো। হঠাৎ মালবিকার অলক্ষ্যে অদৃশ্য এক আকর্ষণে উন্মুক্ত অন্তর মেলে ওর মুখপানে চেয়ে থাকে। চোখের পলক পড়েনা। যেন নতুন দেখছে। ইতিপূর্বে দৃষ্টি বিনিময় হতেই চোখ সরিয়ে নেয়। একগাল হেসে ভাস্করের পৃষ্ঠদেশে আলতোভাবে একটা চড় মেরে বলল,-“আরে এয়ার, ইয়ে হুই না বাত। দোস্ত হোতো এ্যায়সা। আমায় বাঁচালি মাইরি। গিভ মি ফাইভ।” বলে প্রসন্ন মেজাজে ভাস্করের সাথে হাতে হাত মেলায়। সেক্হ্যান্ড করে।


কি বলবে ভাষা খুঁজে পায়না মালবিকা। আনন্দে একেবারে আত্মহারা। হৃদয়ের দুকূল জুড়ে খুশীর বন্যায় প্লাবিত করে চোখমুখ উজ্জ্বল দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হচ্ছিল, দ্রুত ছুটে গিয়ে দিব্যেন্দুকে প্রেমালিঙ্গনে জড়িয়ে ধরতে। ওর উষ্ণ বক্ষপৃষ্ঠে আঁছড়ে পড়ে ওর বলিষ্ঠ বাহুদ্বয়ের বন্ধনে পিষ্ঠ হয়ে যেতে। ইচ্ছে হচ্ছিল, দিব্যেন্দুর ঘন পশমাবৃত প্রশ্বস্ত বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ওর পুরুষালী দেহের উষ্ণ অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকতে। একেবারে লীন হয়ে যেতে। অনুভব করে, এতকাল হৃদয়প্রাঙ্গনে অবহেলায় পড়ে থাকা ওর ভালোবাসার ফুল এখনো শুকায় নি। মূর্ছা যায় নি। দীর্ঘদিনের মানসিক বিচ্ছিন্নতায় ওর ভালোবাসায় কোনো প্রভাব পড়েনি। এতটুকুও কমে যায়নি। তাই বুঝি দুটি মানব-মানবীর প্রেম-ভালোবাসা কোনদিন মরেনা। যার কোনো বয়স নেই। সময় অসময় নেই। যে কখনো কারো দোহাই মানে না। কোনো বাঁধা মানে না। সুযোগ এলেই সে আপন গন্তব্যে পৌঁছে যাবেই। যেভাবে আজ ও’ দিব্যেন্দুকে নতুন করে আবিস্কার করে। ওকে নতুন করে একান্তে নিঃভৃতে নিবিড় করে কাছে পেতে ক্রমশ উদগ্রীব হয়ে ওঠে, উতলা হয়ে ওঠে। সবুর সয়না মালবিকার। কিন্তু তাই বলে ভাস্করের সামনে! ছিঃ, তা  কি কখনো হয়! শিক্ষয়িত্রী বলে কথা!
                              

দুই


মুশকিল আসান হতেই শুরু হয়ে যায় রায়চৌধুরীর দম্পতীর অবকাশ যাপনের প্রস্তুতিপর্ব। মালবিকা প্রহর গোনে, কখন আসবে সেই শুভমুহূর্ত। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এসে গেল সেই শুভক্ষণ। ঘুম ভাঙ্গতেই চোখ মেলে দ্যাখে, ঊষার প্রথম সূর্য্যরে স্নিগ্ধ কোমল নির্মল হাস্যেৎজ্জ্বল একটি আনন্দময় সকাল। যেন সমস্ত মানুষগুলিকে অকুন্ঠভাবে আহ্বান করছে, স্বতঃস্ফূর্ত মনে উল্কার মতো দ্রুত কক্ষচ্যুত হয়ে আনন্দময় কোনো এক প্রান্তরে চলে আসার জন্য।


সকাল হতেই প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে বৃদ্ধা মা রমলাদেবী ও বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব ভাস্করকে সঁপে দিয়ে দিব্যেন্দু সানন্দে বেরিয়ে পড়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে, বাইরের রঙ্গিন পৃথিবীতে। সাময়িক অবসর নিয়ে স্বস্ত্রীক রিজার্ভ করা বাসে চড়ে রওনা হয়ে যায় সমুদ্র-সৈকতে। কিন্তু মঞ্জুর হলো না বিধাতার। মাঝপথে গিয়ে তাদের বিশাল যাত্রীবাহী টুরিষ্ট বাসটা হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিকটে পড়ে মৃত্যু কূপের মতো একটি নোংরা কর্দমাক্ত খাঁদের গভীরে। আর সাথে সাথে শুরু হয় আত্মচিৎকার, চেঁচামিচি। কাঁন্নার রোল। একেই চারদিক অন্ধকার। যাত্রীরা কূল-কিনারা খুঁজে পায়না। এমতবস্থায় প্রাণ হারায় অনেকে। কারো কারো গুরুতরোভাবে ঘায়েল হয়ে অর্ধমৃত অবস্থা। আর কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বিকৃত চেহারা নিয়ে বিকলাঙ্গ অবস্থায় প্রায় সাতমাস স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধিনে পড়ে ছিল। সেখানেই রায়চৌধুরী দম্পতী দিব্যেন্দু আর মালবিকা দুজনেই এ্যাড্মিটেড ছিল। তাদের কোনপ্রকার আইডেন্টিটিই সাথে ছিলনা। সব কাদায় মাখামাখি হয়ে গিয়ে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। যে কারণে এতবড় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ তাদের আত্মীয়-পরিজনের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।


একেই বলে নিয়তির নিমর্ম পরিহাস! রায়চৌধুরী পরিবারে কার যে নজর লেগেছিল, সুখের মুখোমুখি হয়েও মাত্র কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে একেবারে গভীর অন্ধকারে ডুবে যায় রায়চৌধুরী দম্পতী। যা ক্ষণপূর্বেও কেউ কল্পনা করেনি। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খন্ডাবে কে! কারো সাধ্য নেই। একদিন সম্পূর্ণ সুস্থ্য সবল হয়ে সশরীরে নিজের জায়গায় ফিরে আসে ঠিকই কিন্তু পাড়ায় ঢুকে নিজের বাড়িই আর খুঁজে পায়না দিব্যেন্দু। সারাপাড়া পরিক্রমা করে বার বার একই জায়গায় অর্থাৎ নিজের বাড়ির প্রাঙ্গনে এসে দাঁড়ায়। আর মনে মনে ভাবে,-এ কি, আমাদের ‘শান্তি কুটির’ কোথায় গেল? এখানে ‘ভবানী ভবন’ লেখা! কি আশ্চর্য্য, বাড়ির নক্সাটাও সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। কিন্তু তাই বা সম্ভব হয় কি করে!


ইতিপূর্বে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, -‘কাকে চাই?’


হঠাৎ অপ্রত্যাশিত অচেনা লোকের মুখদর্শণে হকচকিয়ে যায় দিব্যেন্দু। রুদ্ধ হয়ে যায় ওর কণ্ঠস্বর। দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে মুহূর্তে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। কিছুতেই নিজের চোখদুটোকে বিশ্বাস করতে পারেনা। উত্তেজনায় বিচলিত হয়ে ওঠে। শুকনো একটা ঢোক গিলে বিড় বিড় করে বলে,-এ আবার কে? ভাস্কর কাকে এনে রেখেছে? ভদ্রলোককে আগে কোনদিন দেখিনি তো! মা কোথায়? মাকে দেখছি না! নিশ্চয়ই বাতের ব্যথায় কোঁকাচ্ছে।


অবস্থার বেগতিক লক্ষ্য করে দিব্যেন্দু দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হয়, -নো, সামথিং ইস রং।


দিব্যেন্দু একজন পুরুষমানুষ। এমবিবিএস ডাক্তার। সহজে ভেঙ্গে পড়ার নয়। অজানা আশঙ্ক্ষায় নিমজ্জিত হয়ে ভবানী ভবনের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত নজর বুলিয়ে বলে,-‘আপনি, আপনাকে তো চিনতে পারলাম না! আপনি কে হে মশাই? ভাস্কর কোথায়? ওকে ডাকুন।’


ভদ্রলোকটি একগাল পান মুখে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,-‘আজ্ঞে আমি হইলাম ভবানীচরণ দাস। এ বাড়ির নুতন মালিক। মাত্তর কিনছি!’


শোনামাত্র বুকটা ধড়াস করে কেঁপে ওঠে রায়চৌধুরী দম্পতীর। হাত-পা সারাশরীর অসাড় হয়ে লাগে। একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে হাঁ করে চেয়ে থাকে। চোখে পথ দ্যাখে না। নেমে আসে অন্ধকার। ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল বুকের পাঁজর। অনুভব করে, পায়ের নীচ থেকে মাটিটা যেন সড়ে গেল। ভুলেই গিয়েছিল, ভবানীচরণ দাস একজন বয়স্ক মানুষ। পিতৃ সমতূল্য। দিব্যেন্দু নিজেও একজন ম্যাডিক্যাল ডাক্তার। উচ্চবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবাবের সন্তান। হায়ার এ্যাডুকেটেড। ঘটনার সত্য যাচাই না করে একজন বয়স্ক মানুষের সাথে মিসবিহেইভ করা ওর মোটেই শোভা পায়না। অভদ্রতা দেখায়। কিন্তু এমন সংকটজনক পরিস্থিতিতে কারো হুঁশ জ্ঞান থাকে না। নিজেকেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। দিব্যেন্দুর আঠেরো বছরের পূঁজি ”শান্তি কূটির” আজ অন্যের মালিকাধীনে দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফ্যালে। চোখমুখ খিঁচিয়ে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে তীব্র কণ্ঠে গর্জে ওঠে।-‘বলছেন কি আপনি? এ বাড়ি আপনার? আপনিই এ বাড়ির মালিক? ইটস নট্ পসিবল! এ চত্তরে আগে কখনো তো দেখি নি আপনাকে! মশাই, আপনার শরীরের তাপমাত্রা, মস্তিস্ক ঠিক আছে সব? কি বলছেন আপনি তা জানেন? রাবিশ!’


শুনে সাংঘাতিক চটে যান ভবানীচরণ। চোখমুখ রাঙিয়ে মুখের পেশীগুলিকে ফুলিয়ে একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। উত্তেজিত হয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে প্রচন্ড তোতলাতে থাকেন। ফিচ্ করে পানের পিক ফেলে চোখ রাঙিয়ে তো তো স্বরে বলে ওঠেন,-‘আ-আমারে পাগল পাইছেন! আমার মাথা খারাপ? কে আপনি? আমি কুনো ভাস্করেরে চিনি না। য-যত্তসব আজগুবি কথা। যান, যান, মেজাজ খারাপ কইরেন না। ভালো হইবে না।’


-‘ভয় দেখাচ্ছেন! কি করতে পারবেন আপনি?’


তেড়ে আসেন ভবাণীচরণ। মুখের পেশীগুলি ফুলিয়ে চোখ রাঙিয়ে আঙ্গুল তুলে বললেন,-‘আপনারে লাষ্ট ওয়ার্নিং দিতাছি, আমি পুলিশ ডাকুম। কেস করুম। বেয়াদপ মানুষ!’ বিড়বিড় করে আরো কি কি সব বলতে বলতে সদর দরজাটা বন্ধ করে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েন।


ততক্ষণে অবস্থা শোচনীয়। মুহুর্তের জন্য মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেও নিজেকে সামলে নেয় দিব্যেন্দু। কিন্তু মালবিকা, ওকে সামলাবে কে! কে দেবে ওকে শান্তনা! বেচারি ক্ষোভে, দুঃখে, শোকে ভবিষ্যৎ চিন্তা-ভাবনায় অশ্রবন্যায় দুচোখ ভেসে যাচ্ছে ওর। অসহায়ার মতো বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে হুইলচেয়ারে বসে বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কথা বলারও শক্তি নেই। ওদিকে থানা পুলিশের হুমকি শুনে মাথায় বজ্রাঘাত পড়ে দিব্যেন্দুর। অথচ তখনও স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে, নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশী ওর বিশ্বস্থ এবং বাল্যবন্ধু ভাস্কর মিত্র, যার ভরসায় বাড়ির সমস্ত দায়-দায়িত্ব সঁপে দিয়ে গিয়েছিল, সে-ই এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ভাবতে পারেনি, জীবনের সাঁঝ বেলায় এসে নিষ্ঠুর নির্দয়ের মতো এতবড় কঠিন আঘাত হেনে প্রৌঢ়ত্বে ওকে নিঃশ্ব করে একেবারে পথে বসিয়ে দেবে ওরই বাল্যবন্ধু ভাস্কর মিত্র।


হঠাৎ ভবানীচরণ দাস সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে দ্যাখেন, স্ত্রীর হুইলচেয়ারের হাথল ধরে দিব্যেন্দু তখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। ভেবে কূল পায় না, কোনদিকে যাবে? কোথায় যাবে? কিভাবে শেষ থেকে ওদরে জীবন শুরু করবে। ততক্ষণে ভবানীচরণ দাসের একটু একটু করে বোধগম্য হতে থাকে। প্রথম প্রথম লোকের কানাঘুষোয় ঘটনার কিছু কিছু অংশ শ্রুতিগাচর হয়েছিল। তবু কখনো মাথা ঘামান নি। তলিয়ে দ্যাখেন নি।


দুই দুটো জলজ্যান্ত মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হবার পর সারাপাড়ায় যখন হৈচৈ পড়ে গেল, দিব্যেন্দুর বুড়ি মা রমলাদেবী সহ আত্মীয়-স্বজনরা যখন অনুসন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই দিব্যেন্দুর  হৃদয়-প্রাণ ‘শান্তি কুটির’ সবার অলক্ষ্যে বেনামে বেচে দিয়ে, ওকে বেঘর, নিরাশ্রয় করে পলাতক দাগী আসামীর মতো রাতারাতি শহর ছেড়ে অন্যত্রে এখনও পর্যন্ত আত্মগোপন করে রাখে ওরই বিশ্বস্থ বন্ধুু ভাস্কর মিত্র। যা ঘূণাক্ষরেও কেউ টের পায়নি।


ততদিনে আত্মীয় অনাত্মীয়, পাড়া প্রতিবেশী সকলেই যখন রায়চৌধুরী দম্পতীকে নিশ্চিতভাবে মৃত বলে ধারণা করে নিলো, তখন দিব্যেন্দুর বৃদ্ধা মা রমলাদেবীর বুঝতে কিছুই আর বাকি থাকে না। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র ও পুত্রবধূর হারানোর শোকে দুঃখে কাতরতায় মানসিকভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন। “শান্তি কূটির” বিক্রি হবার সাথে সাথেই বুক চাপড়াতে চাপড়াতে তিনি বাড়ি ছেড়ে কোথায় যে চলে যান, আর ফিরে আসেন নি। হয়তো পথেঘাটেই কোথাও মৃত্যুবরণ করেছেন, তা কে জানে!


তিন


আচমকা জীবনে অনাকাঙ্খিত বিপদের সম্মুখীন হয়ে পঙ্গুত্বের গ্লানিতে শারিরীক ও মানসিকভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়ে। তন্মধ্যে দুঃস্বপ্নের মতো সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ায় বিকৃতি চেহারা আর বিকলাঙ্গ শরীর নিয়ে নিথর নির্জীব প্রাণীর মতো সেই দূপুর থেকে উদাসীন অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। জীবনে আশা আকাক্সক্ষা ভরসা কিছুই আর নেই। নেই ইচ্ছে, আবেগ, অনুভূতি, বেঁচে থাকার সাধ।


অবসন্ন ব্যাথাতুর শরীরটা বহন করবার মতোও শক্তি নেই মালবিকার। বুকের ভিতরের সমস্ত ব্যাথা, কষ্টগুলি বার বার বুক ফেটে দু’চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় ঝড়তে থাকে। কিছুতেই সম্বরণ করতে পারেনা। শোকে বিহ্বলে দিব্যেন্দুকে জড়িয়ে ধরে মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে ওঠে।


বেদনাহত বিমূঢ়-ম্লান দিব্যেন্দু, পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়তমা মালবিকাকে শান্ত করার মতো একটা শব্দও আর উচ্চারিত হয়না। কি বলে শান্তনা দেবে! কিছুই তো আর অবশিষ্ঠ নেই। কখনো কি ভাবতে পেরেছিল, জীবনে আনন্দের সময়গুলি এতো শীঘ্রই ফুরিয়ে যাবে! কখনো কি ভাবতে পেরেছিল, জীবন জোয়ারে সুখের তড়ীতে ভাসতে গিয়েই তড়ীখানা আচমকা একেবারে অতল তলে তলিয়ে যাবে! যেখানে কূল নেই, কিনারা নেই, বেঁচে থাকারও কোনো অবলম্বণ নেই।


কিন্তু মানুষের জীবন নদীর প্রবাহ কখনো থেমে থাকেনা। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জীবন নদীর খেয়া পুনরায় বাইতে শুরু করে। তেমনি দিব্যেন্দুও জীবন যুদ্ধে লড়াই করতে করতে একসময় মাথা তুলে দাঁড়িয়েও গেল কিন্তু উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো প্রাণবন্ত মালবিকার চোখের তারাদু’টিতে কখনো কি খুশীর ঝিলিক আর দেখতে পাবে? কখনো কি ওর সুস্থ সবল পরিপূর্ণ শরীর ফিরিয়ে দিতে পারবে কোনদিন? হুইলচেয়ার থেকে আর কি উঠে দাঁড়াতে পারবে কোনদিন? পারবে দিব্যেন্দু সব ফিরিয়ে দিতে? পারবে না। কোনদিন আর ফিরে আসবে না। শুধু নীরব নির্বিকারে বুকের মাঝারে জমে থাকবে একরাশ ব্যথা-বেদনা। না বলা কিছু কথা। কথার আলাপন। আর অহরহ কানে বাজবে, খুশীর বন্যায় প্লাবিত করে ভ্রমরের মতো ভেসে বেড়ানো মালবিকার গুনগুন গুঞ্জরণে অপূর্ব সুরের মূছর্ণা।


স্ত্রীর অলক্ষ্যে পলকমাত্র দৃষ্টিপাতে দিব্যেন্দু লক্ষ্য করে, মন-প্রাণ সারাশরীর বিষন্নতায় ছেয়ে গিয়েছে মালবিকার। এই কয়েক মাসেই অনেক বুড়িয়ে গেছে। চোখমুখও শুকিয়ে মলিন হয়ে ওকে পুতুলের মতো দেখাচ্ছে। কি যেন ভাবছে মালবিকা।


দিব্যেন্দু বিড় বিড় করে বলে ওঠে,-“কিচ্ছু ভেবো না মালবিকা, আমি অঙ্গীকার বদ্ধ। আমার অকুণ্ঠ হৃদয়ের উজার করা নীরব ভালোবাসায় তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দৃঢ় অঙ্গীকারে আমার বুকের সমস্ত কষ্টগুলি যতোই বেদনাময় হোক, লুকিয়ে থাকবে, শুধুমাত্র বিৎদুতের ঝিলিকের মতো তোমার লাবণ্যময়ী মুখের সেদিন ক্ষণিকের উদ্ভাসিত একছটাক অনিন্দ্য সুন্দর হাসির আড়ালে। যা আমার হৃদয়কোটরে আমরণ গেঁথে থাকবে। গেঁথে থাকবে অদৃশ্য এক অনুভূতিতে। আমার স্মৃতির গ্রন্থিতে।”


হঠাৎ মালবিকার গভীর সংবেদনশীল দৃষ্টি বিনিময় হতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল দিব্যেন্দুর। ওর ভারাক্রন্ত হৃদয়ে সেদিনের সেই অনাকাক্সিক্ষত ভয়ঙ্কর রাত্রির যন্ত্রণাদায়ক গহীন বেদানুভূতির তীব্র দংশণে মস্তিস্কের সমস্ত স্নায়ূকোষগুলিকে বাব বার কুঁরে কুঁরে খেতে লাগল। অত্যন্ত পীড়া দিতে লাগল ওর মুমূর্ষ্য হৃদয়কে।


হতাশায় নিরাশায় বুকটা হাহাকার করে ওঠে দিব্যেন্দুর। অনুতাপ আর অনুশোচনার অন্ত নেই। দায়ী করে নিজেকে। মাথাকূটে মরে, সেদিন কেন বাড়ি ছেড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে ছিল? কেন বেড়াতে বেরিয়ে ছিল? একটু একটু করে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে মনের শক্তি। বুকের পাঁজরখানাও ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। মালবিকার মুখপানে চোখ তুলে তাকানোই যাচ্ছে না। এ কেমন বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাস, বিড়ম্বণা, ছলনা, প্রবঞ্চনা!


প্রিয়তমা পত্নী, অর্ধাঙ্গিনী, মালবিকাই যে ছিল, চির অম্লান, চির সজীব, স্নিগ্ধ-শান্ত-কোমনীয় এক উদ্বিগ্ন যৌবনা অনন্যা, লাবণ্যা, প্রেমের মহিমায় দ্বীপ্ত মমতাময়ী এক বিদূষী নারী, হৃদয়হরিনী। যে ছিল দিব্যেন্দুর নিবেদিত প্রাণ, শক্তির উৎস, প্রেরণা, ভাই-বন্ধু-প্রেয়সী সব। যেকথা আজও বলতে পারেনি দিব্যেন্দু। বলাও হবে না হয়তো কোনদিন। যা মালবিকা কোনদিন আর জানবে না। শুধু যন্ত্রের মতোই রয়ে গেল দুজনে।


যুথিকা বড়ুয়া: টরন্টো প্রবাসী গল্পকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী।
jbaruacanada@gmail.com

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com