লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৯৬ বার

অবলোকন: বিষয় ইলিয়াস

ইলিয়াসের গল্পের মেয়েমানুষ

সাদ কামালী

বাংলারিপোর্টার.কম
শুক্রবার, ২৯ সেপ্টেম্বর

মানুষ কই, ব্যাকটি তো মাইয়ামানুষ
কাঠের ল্যাম্পপোস্টের মতো এবড়োথেবড়ো বাঁকাচোরা আশি-বিরাশি বছরের কাঠামোর রমজান আলির ভিতরে শ্লেষ্মা ছাড়া আর কোনো রস অবশিষ্ট নাই যা দিয়ে তারাবিবি তার শরীরের বাসনা চরিতার্থ করতে পারে। শরীর মনের অবদমন সেও করে মধ্যবিত্ত, নিুমধ্যবিত্ত অথবা ভদ্রলোকের ঘরের আরো লক্ষ লক্ষ বউদের মতো ঠিকই, তবে সে ঘাড়-মুখ গুঁজে নিঃশব্দে অবদমন করে যায় না। রমজান আলিসহ বাড়ির সব বাসিন্দাই তারাবিবির চোপার নিচে থাকে। তবুও কি ছেলে গোলজার, ছেলের বউ সখিনা, কাজের মেয়ে সুরুজের মা, এমনকী স্বামী রমজান আলি তারাবিবির ক্ষোভ কষ্ট বিরক্তির কারণ বোঝে !


আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পেই শুধু নয়, বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে ‘তারাবিবির মরদপোলা’ গল্পের তারাবিবির চরিত্রের নজির মেলা ভার। নারীবাদী লেখকের নারীরা অবদমন করতে নারাজ, শরীরের সাধ-আহ্লাদ তারা স্বাভাবিক অস্বাভাবিক উপায়ে মিটিয়ে নেয়। এতে হয়তো ব্যক্তির শান্তি স্বস্তি মেলে। কিন্তু সংসারের দমিত নারীদের ব্যথা, হাহাকার, ক্ষোভ ইত্যাদি পাঠকের বিবেক-বুদ্ধির ঘরে কোনো স্থায়ী আলোড়ন তৈরি করতে পারে কি ! লাশের মতো পড়ে থাকা স্বামীকে অর্ধেক বয়সের স্ত্রী তারাবিবি তবুও রাতের কোনো প্রহরে জাগাতে চেষ্টা করে, ‘অ গোলজারের বাপ!১ গোলজারের বাপ রমজান আলি চুপ করে থাকে, নইলে উঠে তার মরদানি দেখায় তার মতো করে,  খানকি মাগী, তর মরদানি দ্যাখনের খাউজানি উঠছে, না ? তরে মরদ দ্যাখাই। তর হাউস মিটাইয়া দেই আয়’১ বলে বালিশের কাছ থেকে হাতপাখাটা নিয়ে বউকে পিটাতে শুরু করে। ইলিয়াসের সংবেদী কলম তখন কোনো বিপ্লব করে বসে না  বৃদ্ধ স্বামীর হাত থেকে পাখা টেনে কয়েকটা বাড়ি বসিয়ে আপাত বিচার করে ফেলে না। ফলে তারাবিবির ব্যথা, শরীরের দাগ পাঠক বহন করে, এবং যুবক ছেলে গোলজারকে নিয়ে তারাবিবির সারাক্ষণ সন্দেহের হেতু বুঝতে বুঝতে পাঠক দেখে শরীরের সাধ অবদমনের জ্বালায় কেমন করে সে ছেলে স্বামীকে পোড়ায়। বন্ধুর বউ, কাজের মেয়ে অথবা প্রায় যোগাযোগহীন এমন কোনো মেয়েকে নিয়ে তারাবিবি সারাক্ষণ সন্দেহ করে চলছে। সখিনাকেও ছেলের মতিগতি বিষয়ে সতর্ক করে দেয়। সখিনা কাঁদে, গোলজারের সাথে অভিমান করা ছাড়া আর করার কিছু নাই। তারাবিবি এবং সখিনা বাইরে যাওয়ার পর সমর্থ গোলজার এক দুপুরে সত্যি সত্যিই সুরুজের মাকে বিছানায় চেপে ধরে। পাশের ঘরের রমজান আলি টের পেয়ে ভীষণ ক্ষ্যাপে, ‘ঘরের মইদ্যে গুনা, ঘরের মইদ্যে শয়তানি। নামাজ বন্দেগি আমাগো কেমনে কবুল হয়।’২ কিন্তু তারাবিবি আশ্চর্য রকমের শান্ত গলায় রমজান আলিকে থামায়, ‘হইছে, এ্যামুন চিল্লাচিল্লি করো ক্যালায় ? গোলজার কি করছে ? পোলায় আমার জুয়ান মরদ না একখান ? মরদের কাম তুমি বুঝবা ক্যামনে ?২


ইলিয়াসের গল্পের প্রায় সব নারী চরিত্রের মতোই তারাবিবিও স্বামী ছেলের আয়-উপার্জনের ওপর ষোলোআনা নির্ভরশীল। শরীরের সাধ অপূরণের কষ্টে তারাবিবি তড়পায়, স্বামী ছেলের সংসারে সখিনার মতো তারও কিছু করার নাই। ইলিয়াসের মেয়েরা চাকরি ব্যবসা অথবা অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালনের কাজে কেউ এগিয়ে আসে কি ! সমাজের ইতিহাস বা সময়ের প্রবহমানতা বুঝতে তার উৎপাদন ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ভিত্তি কাঠামো এবং উপরিস্থিতি কাঠামোর ওপর ধারণা থাকা জরুরি। কৃষি ও গ্রামনির্ভর অর্থনীতি দেশে বহু আগে থেকেই গ্রামের মেয়েরা তাদের সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। দিনে দিনে সংসার সমাজ বা উৎপাদন কাঠামোয় নারীদের ভূমিকা বাড়ছেই। ভিত্তি কাঠামোয় তেমন জোরালোভাবে না হলেও উপরিকাঠামোয় একটা পরিবর্তন তো অবশ্যই ঘটছে ; আর আখতারুজ্জামানের গল্পের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে শহর ও মধ্যবিত্তের নারীরাও তাদের ভূমিকা সম্প্রসারিত করে চলেছে। এই স্বাভাবিক প্রবহমনতায় সমাজের অভিব্যক্তি ও সংবেদনশীলতারও পরিবর্তন ঘটে। এর প্রতিফলন বেশি দেখা যায় সাহিত্যে। সময় ও সমাজমনস্ক ইলিয়াসের সাহিত্যও ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য আকর, ইতিহাস বা সময় তার সাহিত্যের মূল নায়ক এবং কেন্দ্রীয় ভাবনা। এই কেন্দ্রীয় ভাবনা প্রকাশের জন্য যে মানুষগুলোকে নির্মাণ অথবা অবলম্বন করেন সেই মানুষের ভিতর নারীদের তিনি কিভাবে হাজির করেন ? যৌনতা, সমকামী, মাস্টারবেশন, তার সাহিত্যে বিরল নয়। কারণ যৌনতাও শ্রেণী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তিনি বলেন, ‘আমি সেক্সের পিছনে লিভিং মানে ক্লাসকে দেখতে চাই, সোসাইটি দেখতে চাই।... সেক্সুয়াল ইম্যাজিনেশনের সাথেও ক্লাসের ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।”৩ তবে সেই ইম্যাজিনেশন পুরুষ চরিত্রেরই, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত আটাশটি গল্পের কোনো নারীর নয়। আর এর শুরু ইলিয়াসের লেখালেখির শুরু থেকেই। তার জবানিতে শোনা যাক, ‘অনেক আগে সেই প্রথম দিককার আমার একটা গল্পে আছে একটা ছেলে মাস্টারবেট করছে এবং তার পরিচিত একটা বড়লোকের মেয়েকে কল্পনা করছে।...৩  একটা আন্হেল্দি সিক্ সোসাইটিতে লোকে মাস্টারবেট করে অথবা ‘হি ইজ ইনক্যাপাবল  অফ্ হ্যাভিং এ পার্টনার,  অন্তত পার্টনার নেয়ার ক্ষমতা তার আছে তা নিয়েও সে দ্বিধান্বিত। সে টোট্যালি একজন লোনলি মানুষ।’৩ তারাবিবি সমাজ অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় ইনক্যাপাবল, তবুও সে বা অন্য কোনো বিবি ‘মৈথুন’ করতে পারে না ! আধুনিক ইলিয়াস তো ঔচিত্যবোধে তাড়িত নয়, সবরকম খুঁত সন্দেহ বৈপরীত্য বাতিকসহই ইলিয়াসের মানুষেরা উপস্থিত হয়। তিনি বলেন, ‘... যাকে বলে নীতিবোধ তাতে আমার কোনো আস্থা নেই। নীতিবোধের যে ব্যাপার সেটা আমার মনে হয় ব্রাহ্ম সমাজের টাইপের যেটা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়।’৪


প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’, প্রথম গল্প ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এবং ইলিয়াসের প্রথম নারী অঞ্জু-মঞ্জু-রঞ্জুর ‘বেঁটে, ফর্সা ও গোলগাল’ আম্মা। সংসারের দয়া-মায়া, মঙ্গল-অমঙ্গল তাড়িত শাশ্বত আম্মা। খুব ভাল। কিন্তু অসুস্থ ছেলে রাজুর ডাকে মধ্যরাতে আব্বা-আম্মা ঘুম থেকে জেগে ওঠে, আব্বা বলে, ‘এত রাতেও ঘুমোসনি বাবা !’৫ তখন মানসিক জটিলতায় বিপন্ন রঞ্জুর কানেও ধরা পড়ে, রঞ্জুর একটু দুঃখও হয়- আব্বার কণ্ঠ থেকে সংসারের পিতার ব্যক্তিত্ব খসে পড়েছে দেখে বলে, ‘আব্বাকে বিকেল বেলা অনেক পুরুষ শোনা যায়, এখন এত সাধারণ...।’৬ কিন্তু এই ’মনোরম মোনোটোনাস’ সংসারে আম্মার কণ্ঠ কখনোই মোনোটোনাস নয় ! ‘পায়ের ওপরের পাতায় একজিমার ঘা, ... ছোটোখাটো গর্তে উঁচু-নিচু ভরাট লম্বা কালো মুখ, চওড়া ও রেখাহীন নির্বিকার কপালের’৭ তারাবিবির কণ্ঠস্বরেও শাশ্বত আম্মার সুর নাই। শাশ্বত আম্মা কখনও শরীরের জ্বালায় জ্বলে না। গল্পকারের মতে, তারাবিবির বিছুটি লতার মতো খসখসে কণ্ঠস্বর।’১ ‘উৎসব’ গল্পের আনোয়ার আলি উচ্চবিত্তের কুলীন কলরবে চোখ জিব দিয়ে সুন্দর মনোহর নারী দেখে, দেখে চোখের মণিতে ও বুকের খাঁচায় হাসি ফোটায়। বিত্তবানদের ওইসব নারী দেখতে সবাই সুন্দর এবং কামে ভেজা তাদের কণ্ঠস্বর। আনোয়ার আলি ওই কুলীন কলরবের ভিতর এর ব্যতিক্রম কোনো নারী ব্যক্তিত্ব দেখতে পেল না। ঘরে ফিরে তার হতাশা বাড়ে, অল্পবিত্তের আনোয়ার আলির পোষ্য স্ত্রী সালেহাকে দেখে হতাশা দ্বিগুণ হয়। যথারীতি সালেহাও বেঢপ কোলবালিশের মতো, ‘সালেহা বেগমের পুরু ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে একটা হলুদাভ ও একটা সাদা দাঁত নির্লজ্জ উঁকি দেয়। ... ঠোঁটের কোণে লালার আভাস, সমগ্র মুখমণ্ডলে গ্রাম্যতা, কেবল গ্রাম্যতা তোতলায় ... শাড়ীর ভেতর বুক নেই, পাছা নেই, দিনরাত হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা বেঢপ কোলবালিশ।’৮ এই সালেহা টাইপের মেয়েরা রিপুরতির কায়দাও রপ্ত করতে পারেনি, অন্তত সুন্দরী কামিনীদের দেখে আসার পর আনোয়ার আলির তাই মনে হয়। নাহলে অন্যদিন বিছানায় টাটকা শরীরের স্বাদ ভোগ করতে তো অসুবিধা হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আনোয়ার আলির, দুর্ভাগ্য তার মতো জনজীবনের বাসিন্দাদের। বিত্তবানদের কামকারুময় কণ্ঠস্বর ও শরীর দেখেও নিজের শরীরের শীত তাড়াতে পারে না, বরং রাতের জুয়াড়ি, মাতাল, কুকুর দম্পতির সঙ্গম এবং খিস্তিখেউড় মিলে স্বশ্রেণী-গোত্রের উত্তেজনা তার উত্তাপেই আনোয়ার আলির শরীর থেকে হাত থেকে ঠাণ্ডা রাবারের গ্লাভ্স্ খসে পড়ে। যৌন তাড়নার সঙ্গে জীবনযাপনের মানের সম্পর্কের কথা উৎসব গল্পের ভিতর জড়িয়ে আছে এবং এই বিত্ত-অবিত্তের জীবনযাপন, তাদের যৌন তাড়না বা সেক্সুয়াল স্টিমুলেশনের ব্যাপারটি শুধু পুরুষদেরই, নারীদের ক্ষেত্রে শ্রেণী সঙ্কটের হাঙ্গামা নাই ! শিবপুরাণের একটি মন্তব্য উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না, ‘একমাত্র ভর্তার উপভোগের নিমিত্তই স্ত্রীদিগের সৃষ্টি হইয়াছে। তাহা না হইলে নারী আর কোন কাজে লাগে ?’ উৎসব গল্পে কত রঙের নারী, তাদের কেউই স্ত্রী এবং কাম কর্ম ছাড়া আর কোনো ভূমিকা পালন করে না।


যাদুবাস্তবতার অসাধারণ প্রয়োগ সমৃদ্ধ গল্প ‘যোগাযোগ’ প্রধান চরিত্র রোকেয়ার রূপের বর্ণনার প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন মতো তার অন্তরের কন্যা জায়া জননীর ধ্র“পদীরূপ লেখক প্রতিষ্ঠিত করেছেন পাঠকের হৃদয়েও। সংসারের আব্বারা সব চাকরি, ব্যবসা এবং বাইরের জগতে খুব ব্যস্ত থাকে তো, তাই সন্তান ইত্যাদির প্রতি তাদের একটা উদাসীনতা দেখা যায়। ছেলের জন্য দুঃস্বপ্ন ভরা তন্দ্রা আর জাগরণের ভিতর দিয়ে রোকেয়া ছুটছে। ট্রেনের অন্য একজন যাত্রী মা ছোট বাচ্চাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। রোকেয়া উপযাচক হয়ে ওই মাকে দুই-একটি উপদেশ-বাণী দেয়, অথচ এতগুলো বেটা বইস্যা দ্যাখতাছে, হ্যাগো সামনেই ব্লাউজের বুতাম খোলো...।১০ বাচ্চাটার আব্বা ‘কালো রঙের ১টা মোটাসোটা লোক তেলতেলে চুলওয়ালা মাথার নিচে ১ হাত রেখে, আরেকটা হাত ২ হাঁটুর মাঝখানে, অঘোরে ঘুমায়’।১১ রোকেয়ার ছেলে খোকন এমন করে কাঁদলে তার স্বামী হান্নান খুব রাগ করত, ‘পোলায় চিল্লায় ক্যান ?’১১ সংসারের এই গতানুগতিক পুরুষ স্ত্রীদের আচরণের মতো তাদের ভূমিকাও গতানুগতিক। রোকেয়া সিতারা পিতা, স্বামী-সন্তানের সেবায় ব্যস্ত ; সোলায়মান, হান্নান আহমদউল্লা প্রমুখ চাকরি ব্যবসা ইত্যাদি করছে ; তবে এই গল্পে একজন কর্মজীবী নারীর হঠাৎ একটু আবির্ভাব ঘটে, যদিও গল্পকার তাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে, ‘নার্সের গায়ের রঙ ফর্সার ধার ঘেঁষে, সামনের দু’টি দাঁত একটু উঁচু, ডান চোখের নিচে একটা চিহ্ন।’১২ মিষ্টি হাসির নার্সের চেহারায় ওই খুঁতগুলো থাকতেই হবে।


‘ফেরারী’ গল্পের ফেরারি হানিফ, তার আব্বা, দুলাভাই, ইয়ার-বন্ধুরা সবাই যেমন হয় তেমনি। ছোটবেলার খেলার সাথী তার বোন ফাতেমা এই গল্পে আছে তবে হানিফ এবং অন্য পুরুষদের নিয়েই এ-গল্প। গল্পে ফাতেমা বিবি যত অল্প জায়গা দখল করুক না কেন ইলিয়াস তাকে প্রত্যক্ষ করে তোলে  ‘হানিফের শৈশবকালের একমাত্র বন্ধু ফাতেমা, লম্বাটে মুখে তিনটে বসন্তের দাগ, ডান দিকের দাঁত কটা উঁচু, ঠাণ্ডা, নরম, ঘামে ভিজা, রোগা ও কালো ডান হাতে আঁকড়ে ধরা হানিফের বাঁ হাতের তর্জনী...।’১৩ এবং ‘এতোকাল পর মৃত মায়ের প্রতি বাপের সম্বোধন শুনে ফাতেমা ফোঁৎ ফোঁৎ করে কাঁদে। কাঁদলে ফাতেমাকে আরো খারাপ লাগে, বসন্তের দাগ একটা মিলিয়ে গেছে, আর দু’টোর আকার আরো বেড়ে যাওয়ায় অশ্র“বিন্দু জমে সেগুলো জ্যান্ত গুটি হয়ে দৃষ্টিহীন তাকিয়ে থাকে।’১৪


ইলিয়াসের মেয়েদের হৃদয় আছে, ঘর-সংসারে তারা স্ত্রী জননী হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করে যায়, শাশুড়ি মুখরা হলেও ছেলের বউরা শাশুড়ির সাথে চোপা করে না, তারাবিবিকে সখিনা সমীহ করেই চলে। ‘অসুখ-বিসুখ’ গল্পের শাশুড়ি আতমন্নেসা যতই গজগজ করুক সিতারার মুখে রা নাই, আতমন্নেসাও যখন বউ হয়ে এসেছিল, তখন সেও ছিল মাটির মানুষ, সংসারের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য করতে করতে যেমন তার নিজের দিকে তাকাবার সুযোগ ছিল কম, তেমনি অন্যরাও আতমন্নেসার ভালমন্দের দিকে নজর দিত অল্পই। তবু প্রথম গর্ভের সময় সোবহানের বাপ আতমন্নেসার পেটে হাত ডলে দিয়েছিল একদিন বা দুইদিন, এতকাল পরে সব মনে পড়ে না। শাড়িঘেরা রিকশায় রূপমহল বা মায়া সিনেমা হলে নিয়ে গিয়েছিল সোবহানের বাপ। ইণ্টারভালের সময় মেয়েদের ক্লাসের আয়া এসে হাতের ভিতর চিনেবাদামের ঠোঙা গুঁজে দেয়। কিন্তু আতমন্নেসা একা একটা বাদামও খায় না, ‘হায় হায় একটা বাদাম ভি খাও নাই ?’১৫ আতমন্নেসা শরমের চোখে বলে, ‘অতোগুলি মানুষের সামনে ক্যামনে খাই।’ সোবহানের বাপ উত্তর দিতে দেরি করে না, ‘হায়রে, মানুষ কই দেখলা, তোমার আগে পিছে ব্যাকটি তো মাইয়া মানুষ ! হায়রে বিবি আমার, বাঙ্গুবিবি একখান !’১৫ আতমন্নেসার মতো আর কোনো ‘বাঙ্গু বিবিই’ বোঝে না, তারা মানুষ না মাইয়া মানুষ, যোনি জরায়ু আর সেবা করার জন্য দু’টি হাতসমেত অসম্পূর্ণ মানুষ।


‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পের কিশোরী মিলি ঘোরের ভিতর থাকে, আব্বাস পাগল গালাগালের মধ্যে যেসব কথা বলে, যে স্বপ্ন ও সাহসের কথা বলে সে-সব শুনে শুনে মিলির ভিতর এই ঘোর তৈরি হয়। মুক্তিযোদ্ধা আব্বাসের প্রতি দুর্বোধ্য আকর্ষণ তার দিনে দিনেই বাড়ে। যুদ্ধ, অপারেশন, পরিকল্পনা, আঘাত, বিশ্বাসঘাতকতার কত কাহিনী আব্বাস পাগল ফুটপাথে, লাইটপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বকে। মিলির ভাই রানা, তার বন্ধুরাও মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার পর নির্দেশ মতো অস্ত্র জমা না দিয়ে নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছিল স্টেনগান। লুটতরাজ, ব্যাঙ্ক ডাকাতি, মস্তানি ইত্যাদিতে হয়তো ওই স্টেনগানটি ব্যবহৃত হয়। আব্বাস পাগল এই অরাজকতা দেখে প্রতিকারের জন্য চায় রানার স্টেনগানটি। মিলিকেও বলে, রানা যেন স্টেনগানটি তাকে দিয়ে দেয়। মিলি অত্যন্ত সরলমতি বাঙ্গুবালিকা, আব্বাসের কোনো প্রলাপকেই প্রলাপ মনে না করে বিশ্বাস করে নেয়। একদিন সে সত্যি সত্যিই লুকিয়ে আব্বাস পাগলকে স্টেনগানটি এনে দেয়। হায়, আব্বাস পাগল তো তখন আর পাগল নয়, রানারাই তাকে চিকিৎসা করিয়ে ভালো করে দিয়েছে। সুস্থ আব্বাস মিলির আচরণ বুঝতে পারে না, কোন প্রতিকারের কথা তার মনে নাই, স্টেনগান সে চায় না, তার দরকার রানার সাহায্য, ‘রানারে একটু বুঝাইয়া কইও। রানারা কয় বন্ধু একটা ইণ্ডেণ্টিং ফার্ম করছে। রানা ইচ্ছে করলে আমারে প্রোভাইড করতে পারে।’১৬ আব্বাস পাগলের বকবক শুনতে শুনতে মিলির মধ্যে একটা প্রতীতি জন্মেছিল, একধরনের সংক্রমণে উত্তেজনা বোধ করত, এখন আকাশের দিকে মুখ তুললে মিলি টের পায় ‘চারদিকের বাতাস চাপা হয়ে আসছে। চাঁদ তাহলে এতক্ষণে শত্র“র কব্জায় চলে গেছে ! দখলকারী সেনাবাহিনীর একনাগাড় বোমাবাজিতে চাঁদের হালকা মাটির ধুলা এবং বারুদের কণা নিচে ঝরে পড়েছে। রোদ ও বাতাস তাই ধোঁয়াটে ও ভারি, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বৈকি !’১৭ ইলিয়াসের মেয়েদের মধ্যে এই ব্যতিক্রমী বোধ-সম্পন্ন মেয়ে মিলিকে আত্মবিনাশের দিকে কেন যেতে হল ! একটি বোধ-সম্পন্ন মেয়েও বেঁচে থাকতে পারে না ! মিলির আম্মা মনোয়ারা সেইরকম মনোরম মোনোটোনাস, সে জানে ঘরকন্নার কাজ। স্বামী মানুষগুলো তত ভালো বোঝে না। রানার আয় উন্নতিতে মনোয়ারা খুশি, হঠাৎ করে এত টাকা, টেলিভিশনের জোগান কেমন করে হয় তা নিয়ে তার ভাবনা হয় না, বরং ছেলের বড়লোক এক বন্ধুর দিকে চা-প্যাটিস হাতে মেয়েকে ঠেলে পাঠায়, যদি মিলিকে পছন্দ করে ফেলে ! আশরাফ আলী ঘরকন্নার এইসব কি বোঝে, বলে, ‘রনি নিয়ে যাক না !’১৮ মনোয়ারা জোরালোভাবে বলে, ‘না মিলি যাক।’১৮ মেয়েদের এই স্বার্থবোধ যেন তাদের প্রবৃত্তির অন্তর্গত। মিলি এই স্বার্থ বোঝেনি, ‘একটা উড়াল দেওয়ার জন্য মিলি পা ঝাপ্টায়।’১৭


ইলিয়াসের মেয়েদের ভোগ প্রবৃত্তির খবর পাওয়া যায় অনেক চরিত্রেই। তারাবিবি শরীরের স্বাদ-ইচ্ছা অবদমন করে সারাক্ষণ ক্ষেপে থাকে ; আতমন্নেসা নাতির দুধ, মেয়ের ওষুধ ইত্যাদির জন্য লোভাতুর হায়ে থাকে, একটা যদি বিমার হয় সেও মেয়ের মতো সুন্দর সুন্দর রঙ-বেরঙের ওষুধ, কমলা, দুধ খেতে পারবে। মেয়ের ওষুধ চুরি করে খেয়ে বিপত্তিও বাধায়। ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পের জয়নাব বিবি হাহাকার করে দুধের জন্য। নিজেদের যখন দুধওয়ালা গাভী ছিল তখন জয়নাব সব দুধ বিক্রি করে দিত, পরে সেই গরুও বিক্রি করে দেয়। স্বামী কাজ থেকে ফিরলে ওই একবার দেড়সের চালের ভাতে দেড়পোয়া দুধ-কলা মাখিয়ে পরিবারের সবাই খেত। তাছাড়া ওই দুধের ভাগ কেউ কখনো পায়নি। জয়নাবের দুধ দুধ ঘ্যানঘ্যানানি শুনে লেখকের মন্তব্য, ‘গোরু যখন ছিল তখনি কি এই মা মাগী ওদের দুধভাত দিতো ?১৯ ওহিদুল্লা মায়ের কোনো কথার জবাব দেয় না, সে জানে ‘এই তো মেয়েমানুষের বুদ্ধি।’১৯ জয়নাবও একজন বাঙ্গুবিবি। মেয়ে হাজেরা, খাদিজা। ওহিদুল্লা’র বড়ো চাচী বা বড়ো আম্মা হামিদা বিবি জয়নাবের জন্য এক সানকি দুধভাতের ব্যবস্থা করে, ‘হায়রে পোলাপানরে দুধভাত খাওয়াইবার হাউস করছে’২০ বলতে বলতে হামিদা বিবির চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। জয়নাব মেয়েছেলেদের দুধভাত মুখে তুলে দিতে চায়। ওহিদুল্লা ইচ্ছা করলে নিজেই আগে দুধভাত মুখে দিতে পারত, কিন্তু সে পারে না, তার আগে হাজেরা মায়ের হাত কামড়ে নিজের জিভে দুধভাত চালান করে দেয়। লেখক এই দরিদ্র পরিবারের এমন আবেগঘন মানবিক মুহূর্তেও হাজেরার একটু বর্ণনা দিতে ফুরসত পায় ; ‘হাজেরা তার বসন্তের দাগভরা মুখ এগিয়ে হলদে ছ্যাতলাওলা দাঁতের’২১ কথা লেখক ভুলে না। এবং ওহিদুল্লা মনের কথাটি মনে মনে বলে, ‘বেতমিজ আওরৎ ! মেয়েমানুষের বুদ্ধি মানে ইবলিসের উস্কানি।’২১


‘কীটনাশকের কীর্তি’ গল্পের চরিত্রগুলো খুবই অব্ভিয়াস। গ্রামের ক্ষমতাধর ম্যাট্রিক-পাস লম্পটের কারণে রমিজের বোন আছিমুন্নেছা আত্মহত্যা করলে রমিজও তার সাহেব মনিবের মিষ্টি কিশোরী মেয়েকে র‌্যাটম গিলিয়ে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত হয়। ট্রাক ড্রাইভার সোনা মিয়ার কামুক স্বভাব, ব্যবসা-শিল্পের মালিকের বউ সভা-সমিতি করে, রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে, বস্তি ইত্যাদির মেয়েদের ওপর পুরুষের নির্যাতন নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে এবং নিজের বাড়িতে চাকরবাকরদের সাথে চ্যাঁচামেচি, মারধর করলেও রমিজের সাহেব বাসায় ফিরে মাটির মানুষ। অ্যালসেশিয়ান পাশে বসিয়ে অপেক্ষা করে বিকালের চা-টি মেয়ের সাথে খাওয়ার জন্য, বখশিশ দিতেও কার্পণ্য করে না ইত্যাদি। গ্রামে রমিজের মাও রমিজ এবং অছিমুন্নেছার বিবাদে ছেলের পক্ষই নিত, ‘মাইয়ামানুষের অতো লালচ ক্যান রে ?’২২


ইলিয়াসের নিুবিত্ত, মধ্যবিত্তের মেয়েরা যেমন স্বামী ছেলের সংসারে তেমনি বিত্তবানদের বউ-মেয়েরাও ওই ঘরকন্নার বাইরে আর কোনো ঝামেলায় জড়ায় না। মেয়েদের এই গতানুগতিক প্রচলিত ভূমিকার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রসঙ্গত মহাভারতের মহির্ষি অষ্টাবক্রের একটা দোহাই দেয়া যাক। ‘ত্রিলোকমধ্যে কোন স্ত্রীরই স্বাধীনতা নেই। দেখ কুমারাবস্থায় পিতা, যৌবনাবস্থায় ভর্তা, বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রেরা স্ত্রী-জাতির রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকে, সুতরাং স্ত্রী-জাতির কখনও স্বাধীনতা থাকিবার সম্ভাবনা নাই।’৯


প্রচলিত সমাজে নারীদের অবস্থান ও ভূমিকাকে তিনি হয়তো কোনোরকম আদর্শবাদ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, ‘উইশফুল থিঙ্ক’ এড়িয়ে চাক্ষুষ বাস্তব করে তুলতে চেয়েছেন, তার মতো করে। এই কথিত বাস্তবতার চেহারায় কিছু অদলবদল ঘটলেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সরল পর্যবেক্ষণ থেকে সরে আসতে চাননি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আলোচনা ও চিন্তাভাবনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে নারীবাদ। বিশেষ করে তসলিমা নাসরিন বিতর্কে নারীবাদের একরকম পুনর্মূল্যায়ন হলো। বেগম রোকেয়া আবার আলোচিত হন, উদ্ধৃত হন। বেগম রোকেয়ার রচনাবলীর বিক্রির সংখ্যা বেড়ে যায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নির্দিষ্টভাবে নারীবাদ বা নারীর ভূমিকা বিষয়ে কোনো প্রবন্ধ লেখেননি। তার গল্প উপন্যাসের নারীদের নিয়েও নয়। তার দেয়া সাক্ষাৎকারে তসলিমা প্রসঙ্গ এসেছে। ‘নন্দন’ তাকে প্রশ্ন করে, ‘তসলিমা প্রসঙ্গে কিছু বলবেন ?’২৩ এর উত্তরে তিনি তসলিমার উপন্যাস ‘লজ্জা’ যে উপন্যাস বা কিছুই হয়নি সেই কথা জানিয়ে বলেন, ‘মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের জন্যে তসলিমা কোনো সাহায্য করতে পারেনি।... বেগম রোকেয়া থেকে সুফিয়া কামাল আমাদের দেশের নারী আন্দোলনের যে ধারা রয়েছে তাকে তসলিমা এগিয়ে নিতে পারেননি।’২৩ নন্দন অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন করেনি, তসলিমা কি তাহলে নারী আন্দোলন পিছিয়ে দিয়েছেন ? ‘লজ্জা’ প্রকাশ হওয়ার অনেক আগেই নারীর অধিকার এবং সামাজিকতা বিষয়ে লিখিত নিয়মিত কলামগুলো তসলিমাকে জনপ্রিয় করেছিল, জনরোষেও ফেলেছিল। গ্রাম মফস্বল শহরের মেয়েদের মনে তসলিমার সেইসব কলাম নিবন্ধ কোন দাগ ফেলেনি! এই প্রসঙ্গে ইলিয়াস নারী আন্দোলনের অস্তিত্বের কথা বললেন, কিন্তু তার আটাশটি গল্পের কোথাও সেই অস্তিত্বের ছায়া আছে !


আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক চিন্তার সামগ্রিক রূপের সাথে মিলিয়ে হয়তো তার নারী চরিত্রগুলো পাঠ করতে হবে। বুর্জোয়া, পাতি-বুর্জোয়া বা আধা-সামন্ত সমাজেও নির্লজ্জ স্বার্থপর ব্যক্তি হযে ওঠার গল্প তিনি লেখেননি। সমাজের যে কোলাজ তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছেন সেখানে সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় পুরুষ নারী নিরপেক্ষ মানুষগুলোর অবস্থান, দ্বান্দ্বিকতাই হয়তো মুখ্য। তবে, এই অবস্থান, ভূমিকা এবং দ্বন্দ্ব ইত্যাদির ভিতর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একটি সরল সমাজতাত্ত্ব্কি সিদ্ধান্ত করে নিয়েছিলেন  বিত্তহীন, নিমুবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়ে বউ সবাই দেখতে অসুন্দর, দাঁত-উচা, মোটা, বসন্তের দাগভারা মুখ, বুক নাই, পাছা নাই, কোলবালিশের মতো। এর কোনো ব্যতিক্রম নাই। পাশাপাশি বিত্তবানদের মেয়ে বউ সবাই সুন্দর, কামুক। তবে, ইলিয়াস উচ্চ শ্রেণীর নারীদের রূপের বর্ণনার ক্ষেত্রে ততটা কলম খোলেন না। বলা বাহুল্য, সব শ্রেণী গোত্রের নারীই পরজীবী। প্রত্যেকেই এক একখান ‘বাঙ্গুবিবি’। বিত্তবানদের সুন্দরীরা ‘বাঙ্গুবিবি’ হলেও তারা রতি-রিপুর কায়দাকানুন জানে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ধনী শ্রেণীর কোনো নারীরূপের গ্রাফিক্স বর্ণনা না দিলেও ‘ফেরারী’ গল্পে ইব্রাহিম ওস্তাগরের দেখা পরীর বর্ণনা আছে, ‘খয়েরি রঙের খোয়ার ওপর আলগোছে পেতে রাখা সুন্দরীর খালি পাজোড়া ফর্সা এবং নীলচে লাল। চামড়া কি পাতলা !... কেমুন লাগে, বুঝলি মনে লয় চান্দের রোশনি হালায় পায়ের মইধ্যে না হান্দাইয়া বারাইবার পারতেছে না।’২৪


দোহাই 
১, ২, ৭। তারাবিবির মরদ পোলা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স,  ঢাকা, ১৯৯৯,  পৃষ্ঠা, যথাক্রমে ১৩৯, ১৪২, ১৪৭.

৩। কথা পরম্পরা, শাহাদুজ্জামান, পাঠক সমাবেশ ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ৬১
৪। কথা পরম্পরা, শাহাদুজ্জামান, পাঠক সমাবেশ ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ৫৬
৫। নিরুদ্দেশ যাত্রা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১৪
৬। নিরুদ্দেশ যাত্রা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১৬
৮। উৎসব, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ২৩
৯। নারী ধর্ম, ব্রাহ্মণ্য ভাবধারা ও আধুনিক হিন্দুমন, অশোক রুদ্র, পিপল্স্ বুক সোসাইটি, কোলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ৯৫
১০, ১১, ১২, ১৩।  যোগাযোগ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা যথাক্রমে ৪৭,৪৮, ৫৫, 
১৩, ১৪, ২৪।  ফেরারী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা যথাক্রমে ৬৫, ৬৬, ৭২
১৫। অসুখ-বিসুখ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১৩১
১৬, ১৭, ১৮।  মিলির হাতে স্টেনগান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা যথাক্রমে ১৮২, ২৮৩, ১৬৭
১৯, ২০, ২১। দুধভাতে উৎপাত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা যথাক্রমে ১৮৬, ১৯১, ১৯২
২২। কীটনাশকের কীর্তি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ২৪৯
২৩। তৃণমূল, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র সংখ্যা ১৯৯৮, বাংলাদেশ লেখক শিবির, পৃষ্ঠা ৩৩৭


ইলিয়াসের মর্ম দর্শনের চোখ


ঘন ঘন ইংরেজি বাণী উৎকীর্ণ করে অনেক মনীষীর বরাত দিয়ে মামুন হুসাইন ‘ইলিয়াস পুনর্লিখনের কথকতা’ প্রবন্ধে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জগতে ভ্রমণের চেষ্টা করেছেন, তাঁর এই যাত্রা পথে রস ও মগজের গুণ আছে। সৃষ্টিশীল ও মননশীল লেখক মামুনের ভ্রমণশেষে আমাদের চেনা, অথবা যেভাবে চিনতে চাই চেনাতেও চাই, সেই রকম ইচ্ছাপূরণের ইলিয়াসই মূর্ত হয়ে ওঠেন ; অচেনা প্রায় অনাবিস্কৃত ইলিয়াস নন। রাজনৈতিক মঞ্চের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইলিয়াসের জগত ঘুরেফিরে দেখার নির্দেশিত অথবা অনির্দেশিত তরিকা যেন স্থির হয়ে গেছে। পাঠক কোনো মুর্শিদের বয়াত কবুল না করেও তরিকা-পন্থি হতে প্রায়ই বাধ্য হচ্ছে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক মঞ্চে ইলিয়াস চর্চা মঞ্চেরই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পুনঃ পুনঃ ঘটছে ; ভাষণ, প্রবন্ধ, নিবন্ধে ভিন্ন মাত্রার ইলিয়াসকে খুঁজে পেতে কষ্ট হবে। বাংলাদেশ লেখক শিবির-এর প্রকাশনা তৃণমূল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ওপর তথ্যবহুল চমৎকার একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে তাঁর মৃত্যুর প্রথম জন্ম বার্ষিকীর মধ্যেই। এই বিশাল সংখ্যায় কয়েকটি ব্যক্তিগত রচনা বাদে মূল প্রবন্ধ প্রায় সবগুলোই রাজনীতি, শ্রেণী-সচেতন ইলিয়াসের মূল্যায়ন, এমনকি ইলিয়াসের রচনা থেকে পুনঃপ্রকাশ করেন কতগুলো রাজনৈতিক নিবন্ধ, তাঁর অসাধারণ গল্পগুলোর একটিও নয়। ওইসব নিবন্ধের জন্য ইলিয়াস ইলিয়াস হননি। মামুন সাহেবও ওই তরিকায় বুদ্ধি ও আবেগ বিনিয়োগ করলেন, ব্যতিক্রম শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের আর্দ্রতা, অবশ্য কোনো মন্দ পথ নয়, বেঠিকও নয়, খুবই মানবিক। ইলিয়াসের মতো সজাগ একজন মানুষের জগতে বারবার যাত্রা করে আমাদের বোধ লুপ্ত অচেতন নিষ্কাম মরচে-ধরা বিবেক-বুদ্ধিতে টোকা দেয়া, ধুলা সরানো খুব জরুরি বৈকি। স্বভাবগুণে ধুলা স্থির অস্থির সব কিছুতেই জমতে, স্থিতি পেতে মজা পায় ; শরীর মগজ ব্লীচ করলেও ধুলার নিপাত হয় না, ধুলারাশিকে হত্যা করতে না পারলে নিস্তার পাওয়া যাবে কেন ?


বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তুল্য phenomena কমই জন্ম নিয়েছেন। তবে শ্রেণী-সচেতন, দরদী রাজনৈতিক অনেক লেখক জন্ম নিয়ে শ্রেণী ও ধরণীকে সম্ভবত অনেক উপকার করেছেন। প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থার ভিতর পুঁজির আচরণ, তার আকাক্সক্ষা, অনাকাক্সক্ষা, বিকার চরিত্রকে অবলম্বন করে শোষিত শ্রেণীর পক্ষে ইলিয়াস সাহিত্য চর্চা করেছেন, এই রকম একটি পাঠ সম্ভব, এই পাঠ অসম্পূর্ণ খণ্ডিত হলেও সম্ভব। শুধু এই একরৈখিক, স্তরহীন, মাত্রাহীন চর্চায় স্রষ্টা ইলিয়াসের বহুগামিতা উপেক্ষিত হতে দেখলে কষ্ট হয়। তাছাড়া ওই রাজনৈতিক ‘লাইন’ দিয়ে সম্পূর্ণ ইলিয়াসের কতটুকু ব্যাখ্যা করা সম্ভব।


ইলিয়াস তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রচলিত সংস্কার, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসকে অবিরাম আঘাত করেছেন। তিনি সমালোচনা করে বলছেন, ‘বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল উপন্যাসগুলোয় বরং দেশের কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতাকে, প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের মর্যাদাই দেওয়া হয়’ (লেখকের দায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ৩, পৃষ্ঠা ১৫০)। তিনি বলেন, ‘যদি নিজের আর বন্ধুদের আর আত্মীয়স্বজনের স্যাঁতসেঁতে দুঃখবেদনাকেই লালন করি তো তাতে হয়তো মধ্যবিত্ত কী উচ্চবিত্তের সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হবে, কিন্তু তা থেকে তারা নিজেদের জীবনযাপনে কোনো অস্বস্তিও বোধ করবে না, তেমনি পাবে না কোনো প্রেরণাও। তা হলে আমার যাবতীয় সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যতের পাঠকের কাছে মনে হবে নেহাতই তোতলা বাখোয়াজি’ (্ঐ)। স্যাঁতসেঁতে দুঃখ-বেদনার তোতলা বাখোয়াজি ইলিয়াস করেননি, তাঁর সাহিত্যে ব্যক্তি শ্রেণী নির্বিশেষে সমূহ সত্তা নিয়ে হাজির হয়েছে, দুর্বল পঙ্গু ভিরু পায়ে নয়, সগর্বে। তিনি মনে করেন, সাহিত্যে বা ‘উপন্যাসে সব স্তরের মানুষের যে বিপুল সমাবেশ ঘটে শ্রেণী গোষ্ঠী সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে বিচিত্র জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি হয়, মানুষের কল্পনার যে বাঁধভাঙ্গা প্রকাশ ঘটে তা ঔপনিবেশিক আর্থসামাজিক ও মনস্তাত্বিক ব্যবস্থার প্রতি তো রীতিমতো হুমকি’ (ঐ)। তো ওই একমুখী শ্রেণীতত্ত্ব দিয়ে বিচিত্র জীবন্ত প্রথা সংস্কার-বিরোধী ব্যক্তি-মানুষের গল্প মূল্যায়ন করতে চাইলে শিল্পীর সার্বভৌম অর্থাৎ ইলিয়াসের সার্বভৌম প্রকাশকে নগণ্য করে তোলা হয়।


ইলিয়াসের সৃষ্টিশক্তি, জিজ্ঞাসু-শক্তি, অবচেতন নির্মাণের শক্তি, তাঁর মানসক্রিয়ার জটিলতা এবং চেতনাকে বুঝতে তরিকাবন্দি পথ থেকে অন্যদিকেও বোধ ও দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে। সংবেদনশীল সময়, সমাজ, ইতিহাস এবং জাতির, ব্যক্তিরও সমগ্রতা খুঁড়ে খুঁড়ে দেখার প্রয়াসি ছিলেন ইলিয়াস। সাহিত্যে বিদ্বেষ, ভালোবাসা, ঘৃণা, ভঙ্গি, কামসহ সামাজিক চিন্তা, চেতনা, ভঙ্গি ও কার্যকারণ ইলিয়াস উপেক্ষা করেন না। বিশ্বাসে আলোড়িত মানুষের মনোজগতে ঢুকে তার আশঙ্কা নিয়ে সিরিয়াস খেলা খেলতেও তিনি মজা পান।


মনোজগতের ঘুলঘুলিও ইলিয়াস খুব নিকট থেকে দেখেছেন, তাঁর দেখার দৃশ্যগ্রাহ্য চোখ দু’টির পিছনে মর্ম দর্শনের বিশাল চোখ আছে। সেই চোখের দ্রষ্টব্য, ইলিয়াসের দৃশ্যাতীত দৃশ্য দেখার ক্ষমতাকে আমাদের সীমাবদ্ধ মগজের ফ্যাড়ে প্রায়ই একরৈখিক করে ফেলি। তাঁর অপটিক্যল দৃষ্টির ওপর +২-৩ বাইফোকাল কাচ দিয়ে ইলিয়াসের দেখার ক্ষমতার স্ট্যাণ্ডার্ড আমরা করে নিয়েছি। কিন্তু ওই কাচের নিচে চোখের পাশে মাংসের ভাঁজে পাতলা ঠোঁটের চারপাশে মিষ্টি অথচ ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ মাখা হাসির তরজমা এখনো করা গেল না। তেভাগা আন্দোলন, কৃষক ফকির বিদ্রোহ, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, পাকিস্তান সৃষ্টি, সৃষ্টির পর স্বপ্নভঙ্গ, একই দুষ্টচক্রের আবর্তে কৃষক-সাধারণ এই সব কত শত বিষয়ের সঙ্গে তাঁর ভাষায় ‘শ্রেণী গোষ্ঠী সম্প্রদায় নির্বিশেষে যে বিচিত্র মানুষের সৃষ্টি’র পাশে অনেকটা পরিসর দিয়ে কুলসুমকে খেয়াবনামা’য় বসিয়েছেন, তরিকাপন্থি আলোচনায় কুলসুমের কিন্তু জায়গা হয় না। ‘ঘ্যাগি মাগী’ ফুলজান মোটা ভারি শরীর নিয়ে তাহলে কি করবে ? তমিজের ফেরার পথে, তমিজের স্বপ্নেই তার খোয়াব নিহিত ! ইলিয়াসের আলোচকগণ ফুলজানের দিকে তাকাবে না ! প্রিয় মামুন, বলুন তো, তমিজের বুড়া বাপের বউ কুলসুম কেন তমিজের গা শুঁকে, গন্ধ নেয়, নাক দিয়ে গন্ধ টানতে টানতে তমিজের ঘাড় গরম করে ফেলে ? কুলসুমও গরম হয় বৈকি। শেষে তো সৎ ছেলে তমিজের সঙ্গে সঙ্গম হয়।  হওয়া সম্ভব। কারণ ইলিয়াস প্রচলিত বিশ্বাস মূল্যবোধ সংস্কারকে আঘাত করতে কুণ্ঠিত নন। এই সঙ্গম খুব আচক্কা নয়, দুর্ঘটনাও নয়, খোয়াবনামা’য় শত শত বাক্য খরচ করে কুলসুম এবং ফুলজানের প্রাক-বিবাহ সঙ্গমের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় ইতিহাসের গা জড়ানো ব্যক্তির ইতিহাসও ইলিয়াস দেখেছেন, এসব ইলিয়াস কেন ঘটালেন ? শ্রেণীর যে রাজনীতি সেই তত্ত্বে এই কাম ক্রোধের আলোচনা কিভাবে করা হবে ! তমিজ অনেক রাতেও না ফিরলে কুলসুমের চোখের সামনে কেন ঘন কুয়াশা ঝোলে ?


Insane আব্বাসের insanity ঘুচে গেলে তার চোখ থেকে ক্রোধ উবে গেলে মিলি স্টেনগান হাতে ছাদ থেকে পড়ে যেতে চায়। তথাকথিত সুস্থ আব্বাস তরুণ মিলির হাত থেকে স্টেনগান ছিনিয়ে নিতে চায় না, এমনকি আব্বাস মিলির চোখ দেখে না, বুঝতে পারে না তার আকাক্সক্ষা ; আব্বাসের লক্ষ্য মিলির ভাইয়ের ইণ্ডেণ্টিং কারবারে কিছু সুবিধা করে নেয়া ; মিলির কষ্টটা কোথায় ? ‘একটা উড়াল দেওয়ার জন্য মিলি পা ঝাপ্টায়’ কেন (গল্প, মিলির হাতে স্টেনগান) ! সৃষ্টিশীল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সমগ্রতার অংশ যেমন  তাঁর সমাজ বাস্তবতার পাঠ তেমনি ব্যক্তি সত্তার সকলদিকের নির্মোহ পাঠও ইলিয়াসের সমগ্রতার অংশ । সজ্ঞান চেতনার এই পাঠ সংবেদী ইলিয়াস অনেক আগেই করে নিয়েছেন। কিন্তু ইলিয়াসের  সংবেদী ও সজ্ঞান চেতনার আড়ালে অবচেতনার নির্মাণ দর্শন করতে আমরা কেন বারবার ব্যর্থ হই ! তাঁর সমাজ বাস্তবতার পাঠ নিয়ে ‘১৪টি দাবি’ এবং দাবি-সংক্রান্ত রাজনীতির সংস্কৃতিটুকুই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নন। যুবক, মাঝারি বয়স পুরুষের মাস্টারবেশন বিষয়ে রাজনৈতিক ইণ্টারপ্রিটেশনও ইলিয়াসের সমগ্রতা নয়। রোকেয়া’র (যোগাযোগ) ম্যাজিকাল দিকটি লক্ষ্য করুন, কেন রোকেয়ার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা খচখচ করে। এই যোগাযোগ সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর ইলিয়াস, ’সমাজ বাস্তবতা’ তখন রেল লাইনের খোয়াতে শুয়ে ছিল। কুলসুম, ফুলজান (খোয়াবনামা) তারাবিবির (তারাবিবির মরদ পোলা) কাম, অবদমিত কাম, পাশেই আছে ‘উৎসব’ গল্পের আনোয়ারের বিরক্তি। কুকুর দম্পতির সঙ্গম আনোয়ারের শরীর গরম করে, বরং বিত্তবানদের কামকারুময় কণ্ঠস্বর ও শরীর দেখেও নিজের শরীরের শীত তাড়াতে পারে না, রাতের জুয়াড়ি, মাতাল, কুকুর দম্পতির সঙ্গম এবং খিস্তিখেউড় মিলে স্বশ্রেণী-গোত্রের যে উত্তেজনা তার উত্তাপেই আনোয়ার আলির শরীর থেকে হাত থেকে ঠাণ্ডা রাবারের গে¬লাভ্স্ খসে পড়ে।  আনোয়ারের এই মানবীয় অনুভূতির পাঠ শ্রেণী তত্ত্বের বাইরে কি সম্ভব নয় ! সুন্দরীদের বিশেষ ধরনের পোশাক, কামোদ্দীপক শরীর ভঙ্গি, আনোয়ারের শীতলতা ঘোঁচাতে পারে না। যদি আনোয়ারের যৌন আবেগ শ্রেণী উপজাতই হয় তবে কুলসুমের কামভাব কোন্ পাঠে বুঝবো ! আনোয়ার কুলসুম তারাবিবির যৌন চেতনা শ্রেণী নির্বিশেষে মানবীয় প্রবৃত্তি। Communist morality-কে তিনি anti-Marxist মনে করতেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত নন্দন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ইলিয়াস বলেন, ‘কমিউনিস্টদের জন্যে আলাদা কোনো নৈতিকতা থাকতে পারে তা আমি মনে করি না।... অনেক কমিউনিস্ট লেখক আছেন, যাঁরা মানুষের যৌন জীবনকে দেখতে চান না, কৃষককে মহান সংগ্রামী  হিসাবেই দেখতে চান কেন ? সেই কৃষকের মধ্যে কি ফাঁকিবাজির ভাঁওতা থাকতে পারে না ? এগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া একধরনের শুচিবায়ুতা’ (তৃণমূল ৪র্থ সংখ্যা ১৯৯৮)।


ইলিয়াস চরিত্র সৃষ্টি করেন না, চরিত্রকে মাত্র অবলম্বন করেন চেতন অবচেতনকে প্রকাশ করার জন্য। তাঁর ছোটগল্পের আখ্যান অংশটুকুও টুল্স হিসেবে ব্যবহৃত হয় সমাজ সচেতনতা এবং অবচেতনের প্রকাশের নিমিত্তে। এই প্রকাশ সামর্থ্যইে তাঁর রচনা শিল্প হয়ে ওঠে। কোনো মহাজনের দোহাই না দিয়েও বলা যায়, মানব সত্তা অসীম সম্ভাবনার সমাহার। সেই অসীম সম্ভাবনার কিছু কিছু দরজা দিয়ে ইলিয়াসের মতো ঈশ্বর লেখক স্বচ্ছন্দে ঘোরাফেরা করেন। সেই দরজার পথে চোখ রাখার চোখ আমরা সৃষ্টি করতে পারছি না ইলিয়াসের একরৈখিক অথবা শুধু রাজনৈতিক পাঠের জন্য।


প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকে অবলম্বন করেই ইলিয়াসের মতো স্রষ্টা ভিন্ন বাস্তবতা নির্মাণ করেন, অভিজ্ঞতার নতুন বয়ান করেন। সমাজ সময়ের অবিকল ডকুমেণ্টারি বা প্রেস বিজ্ঞপ্তি না বানিয়ে নির্মাণ করেন কবিতা, যে কবিতা সকল শিল্পের আত্মা। কবি অথবা ঈশ্বর ইলিয়াস সৃষ্টি করেন ‘যোগাযোগ’ ‘কান্না’র মতো গল্প, ‘খোয়াবনামা’র মতো উপন্যাস। কবিতার ঘাটতি হলে ‘কীটনাশকের কীর্তি’র মতো গল্প বানান ; কীটনাশকের কীর্তি পাঠের জন্য সম্ভবত একটি চোখে হলেই চলে, সেই তরিকাবন্দি চোখের অভাব নাই।


আল্লাহর অপরিচিত পবিত্র ভাষার পাঠ শেষে আফাজ আলি মোনাজাতের জন্য হাত তোলেন তখন, আসমানে আল্লাহ আর জমিনের লেখক ঈশ্বরের ঠোঁটে চিকন হাসির রেখা মুদ্রিত হয়, আফাজ আলি লেখক ঈশ্বরের মর্জি মতো মুর্দার নাম হায়াৎ হোসেন খান না বলে ছেলে মোহাম্মদ হাবিবুল্লার নাম উচ্চারণ করে ফেলে। নাম ভুল করলেও হয়তো আলিমুল গায়েব আল্লা ঠিকই সংশোধন করে নিবেন। কিন্তু ইলিয়াস ভুল সংশোধন চান না। তিনি আফাজ আলির গভীর অন্দরে ছেলের জন্য যে আশঙ্কা লুকিয়েছিল যে কথা এভাবে হয়তো আফাজ আলি নিজেও জানত না, সেই আশঙ্কা অবচেতন থেকে আকস্মিক ভাবে  ঠোঁটে এনে দিয়েই শেষ করেন না, তার বাস্তবতা তৈরি করেন। আফাজ আলির পুত্র শোক আহাজারি নিষ্ঠুর ইলিয়াস এড়াতে চাননি। ‘কান্না’ গল্পের ইলিয়াস এভাবে ইশ্বর হয়ে উঠতে চান। ইলিয়াস তো একজন চেরাগ আলিও (খোয়াবনামা), চেরাগ আলির শোলক কি ইলিয়াসের শোলক নয় !...


তানার লানতে ফাটিয়া চৌচির।
নবস্রোত তালাশিয়া দরিয়া অস্থির ॥
সেইমতো ব্রহ্মপুত্র বহে যমুনায়। ...


(বাংলাদেশ লেখক শিবির আয়োজিত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্মদিন উদ্যাপনের মঞ্চে কথা সাহিত্যিক মামুন হুসাইন ‘ইলিয়াস পুনর্লিখনের কথকতা’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন। প্রবন্ধের আলোচনা হিসেবে এই নিবন্ধটি [ইলিয়াসের মর্ম দর্শনের চোখ]  পাঠ হয় ওই মঞ্চেই। তবে অবশ্যই এই নিবন্ধ শুধু মামুনের প্রবন্ধের আলোচনা নয়)।


সাদ কামালী

সাহিত্য এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com