লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৯ বার
হায় সুন্দরী প্রতিযোগিতা!
আহসান কবির
বাংলারিপোর্টার.কম
বুধবার, ১১ অক্টোবর ২০১৭

‘ক্ষুধা ও সৌন্দর্যবোধের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে সব দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারী, সেখানে মাংসল হওয়া রূপসীর লক্ষণ; যে সব দেশে প্রচুর খাদ্য আছে, সেসব দেশে মেদহীন হওয়া রূপসীর লক্ষণ। এজন্যই হিন্দি আর বাংলা ফিল্মের নায়িকাদের দেহ থেকে মাংস চর্বি উপচে পড়ে। ক্ষুধার্ত দর্শকেরা সিনামা দেখে না, মাংস ও চর্বি দেখে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে’। মন্তব্যটি প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের।


হুমায়ুন আজাদের মন্তব্যের মতোই ছিল আগেকার কৌতুক! যেমন কোনও এক দশতলা ভবনের ছাদে সিনেমার শ্যুটিং হচ্ছে। ভবনের অন্য বাসিন্দাদের মনে হলো ভবন কাঁপছে। তারা ভূমিকম্প ভূমিকম্প চিৎকার করে ভবন ছাড়া শুরু করলো। পরে জানা গেলো ভূমিকম্প নয়, নায়িকার নাচের শ্যুটিং হচ্ছিল!


তবে বাংলাদেশে সম্ভবত এখন প্রচুর খাদ্য রয়েছে! চালের দাম যতই বাড়ুক, তাতে কিছু যায়-আসে না। এ কারণেই ‘মাপ মতো’ হতে অর্থাৎ কার ভালো মেদহীন জিরো ফিগার, সেই প্রতিযোগিতা চলে এসেছে বাংলাদেশে। এই প্রতিযোগিতাটাই কেমন যেন! ইংরেজদের পোশাক ও পণ্য বর্জন করতে একদা মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধী নিজের সব পোশাক, সুগন্ধী পুড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় ঐতিহ্য এবং একেবারেই সাধারণ মানুষের পোশাক পরা শুরু করেছিলেন, আজীবন সেটাই পরে থেকেছেন। ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর এই ত্যাগকে ব্যঙ্গ করে ব্রিটিশ মিডিয়া ‘হাফ ন্যুড ফকির’ (half nude fakir) বলে সম্বোধন করতো! আর গান্ধীর চেয়েও সংক্ষিপ্ত পোশাক পরা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মেয়েদের বলা হয় না ন্যুড! তারা ড্যাম স্মার্ট! তারা ‘বিড়াল হাঁটা’ হেঁটে পুরুষের নির্দেশিত পথে নিজেদের পণ্য করেই রাখে! ঘোষণা দিয়ে প্রচার করা হয় তাদের শরীরের মাপ।


একেবারে শুরু থেকেই এই সুন্দরী প্রতিযোগিতা কেমন যেন। পৃথিবীর অনেক কিছুতে যেমন অতীত বা মিথ খোঁজা হয়, ঠিক তেমনি বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে, গ্রিসের কারিন্থ শহরে। নতুন শহর ব্যাসিলিসের উদ্বোধনের সময়ে শাসনকর্তা কিপসেলাস এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে নিজ স্ত্রীকেই শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বানিয়েছিলেন! বলা হয়ে থাকে এখনও সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজকরা কোনও না কোনোভাবে সেই পথ ধরেই হাঁটছেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে তাই সবচেয়ে প্রচলিত কৌতুকটা এমন–পাঁচজন প্রতিযোগী সংক্ষিপ্ততম পোশাকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কার আত্মবিশ্বাস কেমন সেটা জানতে প্রশ্ন করা হলো—কে হতে পারে সেরা সুন্দরী? একজন উত্তর দিলো—সবচেয়ে ভালো করে যে আয়োজকদের মনোরঞ্জন করতে পারবে, সেই হবে সেরা!


ইংল্যান্ড আমেরিকায়ও এই প্রতিযোগিতা নিয়ে কম সমালোচনা হয় না। ১৮৫৪ সালে প্রথম যখন এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, তখনই বিস্তর সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯২১ সালে এই প্রতিযোগিতা নতুন করে শুরু করা হয়, কিছুদিন এদেশের লাক্স ফটো সুন্দরীর মতো ফটোশুট করে ফটোজেনিক চেহারা ও ফিগার কার ভালো, সেটা বিবেচনায় রেখে সুন্দরী নির্বাচন করা হতো। ১৯৫০-এর আগে-পরে আমেরিকার নারী সৈনিকদের মধ্যে সাঁতারের পোশাকে কাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ও সুন্দরী মনে হয়, সেই প্রতিযোগিতা হতো। ১৯৫২ সালের পর থেকে নিয়মিতই হতে থাকে মিস ইউনিভার্স নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা।


প্রতিযোগিতার ধরন ও সবকিছু এক হলেও মিস ইউনিভার্স আয়োজন করে থাকে মিস ইউনিভার্স ফাউন্ডেশান। এই সুন্দরী  প্রতিযোগিতাটা মূলত আমেরিকানির্ভর। আর ইংল্যান্ডনির্ভর মিস ওয়ার্ল্ড আয়োজন করে থাকে মিস ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশান । ১৯৫১ সাল থেকে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছিলেন এরিক মার্লো। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী জুলিয়া মার্লো এর দেখভাল করেন।


এই প্রতিযোগিতার একটা ব্যাঙ্গাত্মক দিকও আছে। থাইল্যান্ডে প্রতিবছর হাতি রক্ষা কর্মসূচিকে উৎসাহ দিতে আয়োজন করা হয়ে থাকে ‘মিস জাম্বো কুইন’ প্রতিযোগিতার। কমপক্ষে আশি কেজি ওজন না হলে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া যায় না। এই সুন্দরীদের শেষ জীবন কাটে নিজের ওজন কমাতে আর রোগ শোক থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার সংগ্রামে। এই জাম্বো কুইনদের নিয়ে নাকি আয়োজকদের কোনও আগ্রহই থাকে না! মিস জাম্বো কুইন প্রতিযোগিতা থাইল্যান্ড ছাড়া আরও কয়েকটি দেশে অনুষ্ঠিত হয়। নারীর প্রতি সীমাহীন অশ্রদ্ধা দেখাতে মিস ল্যান্ডমাইন (যারা মাইনে পা হারাতেন তাদের নিয়ে প্রতিযোগিতা। ধৃষ্টতার একটা সীমা থাকা উচিত) প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো, আয়োজন করা হতো মিস অ্যাটমের! কলাম্বিয়াতে দাগি নারী আসামিদের ভেতর কে বেশি সুন্দরী ও আকর্ষণীয়, সেটা নিয়েও করা হয় প্রতিযোগিতার আয়োজন। ব্রাজিলে আছে ‘মিস বাম বাম’ প্রতিযোগিতা। কোন মেয়ের নিতম্ব কত বড়, তা নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন! বুরুকিনা ফাসোতে এই প্রতিযোগিতার নাম ‘মিস বিম বিম’ যা যৌনতার অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশ্ব বা রাষ্ট্রের পুরুষতন্ত্র নারীকে ছোট করার সব আয়োজন নিয়ে শত বছর ধরেই সমালোচনা আছে। তবু নারী যেন এসব ছিন্ন করে বের হতে পারে না।


রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাই লিখেছিলেন—‘সমাজের যাতাকলে আটকা পরে আছি/ছিড়িতে না পারি দড়াদড়ি!’


বলা হয়ে থাকে মেয়েদের ‘মাপ মতো’ হওয়ার এই প্রতিযোগিতায় তাদের বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব, সাহস, মানসিকতা, মানবিকতা, ধী-শক্তি এবং সাধারণ জ্ঞাণ যাচাই করা হয়। কিন্তু এই সব যাচাইয়ের পরীক্ষায় পুরুষ বা আয়োজকদের নির্দেশিত পোশাক কেন পড়তে হবে? কেন একজন মেয়েকে কোটি কোটি মানুষের সামনে এমন পোশাকে দাঁড়াতে হবে? কেন নগ্নতা ভোগ করার পর একজন নারীকে সুন্দরী বলা হবে? যে নারী ইট ভাঙে কিন্তু পরম মমতায় তার সন্তানকে আদর করে, যে নারী বিমান বা ট্রেন চালায়, যে নারী পুলিশ, সেনা বা নৌবাহিনীতে কাজ করে, শুধু সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে ‘বিড়াল হাঁটা’ হাঁটবে না বলে তারা সুন্দরী না? তারা সেলিব্রেটি না, কেউ তাদের চিনবেও না!


বাংলাদেশে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন ২০১৭ সালে ভালো প্রচার পেয়েছে। যে মেয়েটি প্রথম শিরোপা জিতেছিল বিবাহিত হওয়ার কারণে তার শিরোপা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। গ্রিসে প্রথম আয়োজনের সময়েও বিতর্ক ছিল, প্রথম যে আমেরিকান নারী বিশ্বসুন্দরী হয়েছিলেন, সেই মারজেরি ওয়ালেসও খেতাব হারিয়েছিলেন। খেতাব জেতার পর দেখা গেলো তিনি পিটার রেভসনের স্ত্রী এবং গায়ক টম জোনসের গার্লফ্রেন্ড! মারজেরির মতো অভিনেত্রী লিওনা গেজও বিশ্ব সুন্দরী হয়েছিলেন। পরে জানা গিয়েছিল তিনি দুই সন্তানের মা! ভেনেসা উইলিয়াম ছিলেন প্রথম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান যিনি শিরোপা জিতেছিলেন। নগ্ন ছবি ফাঁস হয়ে গেলে তিনিও শিরোপা হারান। এমন নগ্ন ছবি তোলার দায়ে গ্যাব্রিয়েলা ব্রাম, ক্যারি প্রিজন ও কারিদা ক্রিস্টহেইলি বিশ্ব সুন্দরীর খেতাব হারান। আসলে শুরু থেকেই এই প্রতিযোগিতাটা কেমন যেন!


বিশেষ দ্রষ্টব্য: তসলিমা নাসরিনের একটা মন্তব্য এমন—নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সামান্য সচেতন হলে নারীরা নিশ্চয়ই বুঝতেন যে, জগতে যত নির্যাতন আছে তাদের জন্য, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্যাতন হলো নারীদের সুন্দরী হওয়ার জন্য লেলিয়ে দেওয়া! বাংলাদেশ থেকে যে সুন্দরী বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে, তার কপালে কী আছে বলা না গেলেও এইটুকু বলা যায় যে, ভারতে ছয় বছর মাত্র বিশ্ব সুন্দরীরা ছিলেন, আগে বা পরে সেখানে আর কোনও সুন্দরী নেই! কারণ ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছয়জন ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী হন। তাদের ভেতর সুস্মিতা সেন, ঐশ্বরিয়া রাই, লারা দত্ত, যুক্তমুখী ও প্রিয়াংকা চোপড়া জনপ্রিয় ছিলেন; এখনও আছেন। আর ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালপর্যন্ত বিশ্বসুন্দরী প্রতিযেগিতার আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ছিলেন বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের আয়োজনে যারা সুন্দরী হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনেরও অভিযোগ তুলেছিলেন। বাংলা ট্রিবিউন


লেখক: রম্যলেখক

মতামত এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com