লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৪ বার
বাংলাদেশের নোবেল বিজয়
প্রভাষ আমিন  
বাংলারিপোর্টার.কম
মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর ২০১৭

প্রতি বছরের মত এবারও ৬ অক্টোবর নরওয়ের অসলোতে ঘোষণা করা হয় এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার। ঘোষণার পর আমি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম ‘জানি না কেন, এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক কৌতূহল ছিল। সবার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে, দ্যা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্স-আইক্যান। আমি নিজের মূর্খতা স্বীকার করছি, এই সংগঠনের কাজ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, ইন ফ্যাক্ট নামও শুনিনি। ‘‌


এই স্ট্যাটাসে পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই নানা মন্তব্য করেছেন। তবে আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী ফোন করে বললেন, আমার স্ট্যাটাসটি দেখে তার মনে হয়েছে, শেখ হাসিনা নোবেল না পাওয়ায় আমি খুব হতাশ এবং শেখ হাসিনাকে না দিয়ে আইক্যান’ এর মত একটি অখ্যাত সংগঠনকে নোবেল দেয়ায় আমি কষ্ট পেয়েছি। তার মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি দ্বিমত পোষণ করেছি। তবে তাকে দোষ দেইনি। এ নিছকই আমার সীমাবদ্ধতা, নিজের মনের ভাব সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারার ব্যর্থতা। ব্যক্তিগতভাবে আমি শেখ হাসিনাকে পছন্দ করি। কিন্তু তিনি এ বছর শান্তিতে নোবেল পাচ্ছেন, এমন অপপ্রচার আমি বিশ্বাস করিনি, শামিলও হইনি। বরং আমি মনে করেছি, এই অপপ্রচার চালিয়ে শেখ হাসিনাকে বিব্রত করা হয়েছে, তাঁর অর্জনকে খাটো করা হয়েছে। আর নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আসার অত উচ্চ ধারণাও নেই।


অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধী নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। কিন্তু হেনরি কিসিঞ্জার, শিমন পেরেজ, আইজ্যাক রবিন, অং সান সু চির মত যুদ্ধবাজ ও গণহত্যাকারীদের গলায় শোভা পাচ্ছে নোবেল শান্তির পদক। তাছাড়া নোবেল পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্জনের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি প্রাধান্য পায়, নজর থাকে মার্কিন স্বার্থের দিকে। তা্ই তো কিছু না করেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে যান বারাক ওবামা। চীনকে ঘায়েল করতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় দালাইলামা বা লিও জিয়াওবোকে। আমি বলছি না দালাইলামা বা লিও জিয়াওবো নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নন। অবশ্যই তারা পেতে পারেন। কিন্তু তারা পেয়েছেন আসলে চীনকে শায়েস্তা করার জন্য।


তাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া নিয়ে অত ভাবনা নেই। আর ব্যাপারটা এমনও তো নয়, আমরা নোবেল পাইনি কখনো। আমেরিকার ক্ষমতা কেন্দ্রের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে হোক, ২০০৬ সালে ড. ইউনূসের নোবেল জয় উজ্জ্বল করেছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। নানা কারণে দেশে সমালোচিত ও বিতর্কিত হলেও ড. ইউনূসই বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাইনবোর্ড। শুরুতেই আমি আমার মূর্খতার কথা স্বীকার করেছি। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার আগ পর্যন্ত ‘আইক্যান’ এর তৎপরতা সম্পর্কে জানা তো দূরের কথা এই সংগঠনের নামই জানতাম না। তবে আমি জানতাম না বলেই আইক্যান নোবেল পাওয়ার যোগ্য নয়, এমন কুপমন্ডুকও নই। সেলিব্রেটি, খেলা, রাজনীতি, সন্ত্রাস, যুদ্ধ বা নেতিবাচক খবর নিয়ে আমাদের যত আগ্রহ; শুভ উদ্যোগ নিয়ে ততটা নয়। তাই হয়তো ‘আইক্যান’ এর খবর আমার নজর কাড়তে পারেনি। দুই পরমাণু ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার মধ্যে হুমকি-পাল্টা হুমকিতে বিশ্ব যখন উৎকণ্ঠায়, তখন পরমাণূ অস্ত্রবিরোধী একটি জোটের শান্তি পুরস্কার জয় এক ধরনের স্বস্তি আনে আমাদের মনে।


আমরা মুখে মুখে শান্তির কথা বললেও বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস যুদ্ধের। ধর্মযুদ্ধ বা বিভিন্ন আঞ্চলিক যুদ্ধ হলেও দুটি বিশ্বযুদ্ধ বদলে দেয় পৃথিবীর ইতিহাস। সব অস্ত্রই খারাপ, সব যুদ্ধই ক্ষতিকর। তবু যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। তবে পরমাণূ অস্ত্রের ভয়াবহতা ছাড়িয়ে যায় সবকিছু। পরমাণূ অস্ত্র ঘুচিয়ে দেয় ন্যায়-অন্যায়ের বিভেদ। এই অস্ত্রের ক্ষত মানব জাতিকে বহন করতে হয় যুগের পর যুগ। তবে সব খারাপেরই একটা ভালো দিক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে নতুন মানবিক বিশ্বের যাত্রা শুরু, তার কারণও পারমাণবিক বোমা। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা শহরে পারমাণবিক বোমা ফেলে যুক্তরাষ্ট্র, ৩ তিন দিন পর আরেকটি বোমা ফেলা হয় নাগাসাকিতে। হিরোশিমাতে মারা যায় এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ আর নাগাসাকিতে মারা যায় ৭৪ হাজার। পরে এই দুই শহরে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মারা যায় আরো ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। পারমাণবিক বোমার এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে থমকে যায় বিশ্ব।


তারপর থেকেই বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্রের বিরুদ্ধে নানা তৎপরতা চলছে। এরপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার হয়নি আর। ব্যবহার না হলেও ঝুকি কিন্তু কমেনি। বরং বিভিন্ন দেশ নিজেদের আরো বেশি করে পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৯টি দেশের কাছে ১৪ হাজার ৯৩৫টি আণবিক বোমা আছে। ওপরে ওপরে সবার এত ভালো ভালো কথা। বিবেক, সভ্যতা, মানবাধিকারের নানা বুলি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন, পাকিস্তান, ভারত, উত্তর কোরিয়া আর ইসরায়েল এই ৯টি দেশ চাইলে যে কোনো সময় গোটা মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এখন আরো ভয় যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে আছে দুই উন্মাদ ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কিম জং উন। আমার খুব ভয় লাগে কখন কী হয়ে যায়। পাগলের ওপর আমার কোনো ভরসা নেই। বিশ্বে এখন ১৪ হাজার ৯৩৫টি আণবিক বোমা আছে। মানে বিশ্ব এখন সুপ্ত কিন্তু জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসে আছে। এই সময় আমাদের সবার দায়িত্ব পাগলদের শান্ত রাখা, পরমানূ অন্ত্র মুক্ত করতে কাজ করা। কাজটা সহজ নয়। কিন্তু গত ১০ বছর ধরে এই অতি জরুরি কাজটা করে যাচ্ছে আইক্যান। এটি আসলে পরমাণু অস্ত্রবিরোধী একটি জোট। ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই জোটে বিশ্বের ১০১টি দেশের ৪৬৮টি সংগঠন আছে। বর্তমানে এই জোটের সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। আইক্যান’কে নোবেল দেয়া সম্পর্কে নোবেল কমিটি বলেছে, ‘পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ এবং এই অস্ত্রকে নিষিদ্ধ করতে চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টার জন্য তাদের এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো।’ তবে ৪৬৮ কেন ৯৬৮ সংগঠন মিলে চেষ্টা করেও লাভ নেই। কারণ ভয়ঙ্কর ৯টা রাষ্ট্র যদি রাজি না হয়, তাহলে কোনো চেষ্টায়ই কাজ হবে না। এই যেমন গত জুলাইয়ে ‘আইক্যান’ এর চেষ্টায় পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে ১২২টি দেশ সই করেছে। কিন্তু সেই ১২২ দেশের মধ্যে নেই সেই ভয়ঙ্কর ৯টা দেশ তারা সহজে রাজি হবে না, তাই বলে তো থেমে থাকলে চলবে না। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য ‘আইক্যান’ এর পুরস্কারপ্রাপ্তিতেও অনেকে রাজনীতি খুঁজছেন। উত্তর কোরিয়াকে চাপে রাখতে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত সংগঠিত করতেই নাকি ‘আইক্যান’কে পুরস্কার দেয়া হয়েছে।


শিরোনাম পড়ে যারা লেখাটি পড়া শুরু করেছেন, তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে অনলাইনের হিট বাড়ানোর কৌশল বলে গালাগাল শুরু করেছেন। আরেকটু ধৈর্য্য ধরুন। ‘আইক্যান’ এ যে ৪৬৮ সংগঠন আছে, তাতে বাংলাদেশের দুটি সংগঠনও আছে। ফিজিশিয়ান ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এবং বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র-সিবিএস ‌‘আইক্যান’ এর হয়ে বাংলাদেশে পরমাণু অস্ত্রের ক্ষতিকর দিক নিয়ে বাংলাদেশে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। সেই সূত্রে এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারে বাংলাদেশেরও একটু আধটু ছোঁয়া আছে। লিখে রেখো এক ফোটা দিলেম শিশিরের মত হলেও। আমার একটি ব্যক্তিগত আনন্দ হলো ফিজিশিয়ান ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির সভাপতি, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান এবং বাংলাদেশ অধ্যয়ন কেন্দ্রের সংগঠক সঙ্গীতশিল্পী অরূপ রাহী দুজনই আমার পরিচিত, দুজনই আমার পছন্দের। তাই আনন্দটা একটু বেশিই আমার। ৬ অক্টোবরের আগে নাম না জানার অজ্ঞতা আবারও স্বীকার করে ‘আইক্যান’কে প্রাণখোলা অভিনন্দন জানাচ্ছি। অভিনন্দন অধ্যাপক কামরুল হাসান খান এবং অরূপ রাহীকেও। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি শান্তির বিশ্ব গড়ার যে স্বপ্ন দেখছে আইক্যান, একদিন নিশ্চয়ই তা পুরণ হবে। ‘I Can’ একদিন নিশ্চয়ই ‘We Can’ হবে।
সূত্রঃ পরিবর্তন

মতামত এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com