লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ১৩৯ বার

দেহঘড়ি

ডঃ বাহারুল হক​
বাংলারিপোর্টার.কম
বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭

মানবদেহ অসীম ক্ষমতাবান স্রষ্ঠার এক পরম রহস্যময় সৃস্টি। এর নির্মান কৌশল​, এর কার্য্য প্রক্রিয়ার ধারা উপধারা উদ্ঘাটনে মানুষ এখনও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বুঝতে চেস্টা করে যাচ্ছে এর নির্মানশৈলী আর অভ্যান্তরিন অগুন্তি ক্রিয়া-বিক্রিয়া, যেগুলি আবার আশ্চার্য্যজনকভাবে বাহিরের জগতের সাথে গভীরভাবে মেলবন্ধন রক্ষা করে সুনিপুণভাবে চলছে। গবেষনার ফসল হিসেবে দেহের অভ্যন্তরিন ক্রিয়া-বিক্রিয়ার কৌশল যেমন বের হয়ে আসছে তেমনি বের হয়ে আসছে এগুলির উপর বহির্জগতের বিপুল প্রভাবের চিত্রও। বাহিরের তাপ মাত্রার উঠা নামার সাথে, দিন রাত্রির আলো আঁধারির চক্রের সাথে, বায়ুচাপ, বাতাসের আর্দ্রতা, এবং বাতাসের গতি বেগের ভিন্নতার সাথে শারীরবৃত্তিয় ক্রিয়াবলী কিভাবে গতিবান হয় বা স্তিমিত হয় তা আজ বহুলভাবে মানুষের জানা। বাহিরের ভূপ্রকৃতি-জলবায়ু শুধু মানুষের শারীরবৃত্তিয় কার্য্যাবলী যে নিয়ন্ত্রন করে তা নয় আখেরে এ শারীরবৃত্তিয় কার্য্যাবলীর মাধ্যমে ভূপ্রকৃতি-জলবায়ু মানুষের মনোজগৎকে অধিকার করে নেয়​, ফুটিয়ে তোলে মন মানসিকতার একটি  সঠিক রূপ যা ভূপ্রকৃতি-জলবায়ুর​ সাথে মিলে যায়। সেজন্য দেখা যায় চরমভাবাপন্ন  জলবায়ু যেখানে সেখানকার মানুষের সাথে মৃদুভাবাপন্ন জলবায়ু এলাকার মানুষের স্বভাবের অনেক অমিল​। গবেষণা কাজে আবার মাঝে মাঝে পর্যটক হিসেবে ভারতের বড় বড় বিভিন্ন শহরে যাওয়ার এবং থাকার সুযোগ আমার জীবনে এসেছিল​। আমি নিবিড়ভাবে সে সব শহর পর্যবেক্ষণ করেছি। খোঁজ খবর নিয়েছি জলবায়ু-  ভূপ্রকৃতির, আর সব চেয়ে বেশি নিয়েছি সে সব শহরের আমজনতার মেজাজ মর্জি ও স্বভাব চরিত্রের​। আমার সামান্য এ প্রচেস্টায় আমি যা জেনেছি তা হলো এই- দ্রাবিড়িয়ান জন​অধ্যুসিত দক্ষিণ ভারতীয়​ শহর বেঙ্গালোরের অধিবাসিবৃন্দ সবচেয়ে শান্ত প্রকৃতির এবং নির্বিবাদী। পাবলিক প্লেসে স্বর চড়া করে কথা বলেনা, স্ট্রং ওয়ার্ড ইউজ করেনা। আচার​-আচরনে এরা ভদ্র​ সবসময়​। ক্রাইম সংগঠনের হার এ শহরে সবচেয়ে কম। মানুষ সৌন্দর্য্যপ্রিয়। তারা নিজেরা যেমন পরিচ্ছ্ন্ন মেজাজের তেমনি সিটিকেও রেখেছে খুব পরিচ্ছন্ন​। কোন হৈ হল্লা নাই; দাঙ্গা হাঙ্গামা নাই; একেবারে নিরিবিলি ছিমছাম​। মানুষ মেতে আছে বাগান আর আর্ট-কালচার নিয়ে। কর্ণাটকি ক্লাসিক্যাল মিউজিক​, হিন্দুস্থানি ক্লাসিক্যাল মিউজিক থেকে ভিন্ন ধারার এক মিউজিক​, উৎপত্তিস্থল আর প্রানভুমি এই শহর বেঙ্গালোর​। মানুষের অনুরাগ রস আহরন করে করে এ সংগীত কেবলই পুষ্ট ও মিষ্ট হচ্ছে। সারা শহর গার্ডেনে গার্ডেনে ভরা। সেজন্য এ শহরকে বলা হয় গার্ডেন সিটি অব ইন্ডিয়া। এবার আসি ভূপ্রকৃতি আর  জলবায়ু  বিষ​য়ে। বেঙ্গালোর সিটির পত্তন ঘটেছে যে ভূমিতে সেটা একটা মালভূমি, যাকে ইংরাজিতে বলে প্লাটু বা টেবলল্যান্ড​। তাপমাত্রা? কি যে মনোরম​! শীতে সর্ব নিন্ম ২০ ডিগ্রী সেলসিয়াস আর গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বেঙ্গালোরের  জলবায়ুর মেজাজে কোন উথাল পাথাল ভাব নাই , কোন উগ্রতা নাই। সেজন্য বেঙ্গালোরকে বলা হয় এয়ার কন্ডিশন্ড​ সিটি অব ইন্ডিয়া। বেঙ্গালোরে দিবারাত্রির দৈর্ঘ সারা বছর প্রায় সমান​। ফলে এ শহরের মানুষের দেহে মেলাটোনিন নামক ঘুম নিয়ন্ত্রনকারি হরমোনের নিঃসরনের পরিমান এবং নিঃসরন চক্রের ছন্দ সারা বছর থাকে একই রকম​। (মেলাটোনিন হরমোন নিয়ে আমি নিজে গবেষণা কাজ করেছি।) ভূপ্র্কৃতি-জলবায়ু এসবের সাথে মানুষের মন-মেজাজের সম্পর্ক বোঝাতে বেঙ্গালোর একটি ভালো উদাহরন বলে আমার মনে হ​য়​।


বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফলে আমরা জানতে পেরেছি প্রত্যেক দেহে একটি প্রাকৃতিক ম্যাকানিজম বিদ্যমান যে ম্যাকানিজম শারীরিক সব ক্রিয়া বিক্রিয়া যে গুলিতে আবার বহির্জগতের আহ্নিক ও বার্ষিক নিয়মিত চক্রের প্রভাবে নিয়মিত ছন্দম​য় পরিবর্তন ঘটে সে গুলিকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন করে। বিজ্ঞানীরা এই ম্যাকানিজমের নাম দিয়েছেন বায়োলজিক্যাল ক্লক বা দেহঘ​ড়ি। মানব দেহে দেহঘ​ড়ির উপস্থিতির ব্যপারে নিশ্চিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা এর নির্মাতার সন্ধানে নেমে প​ড়েছেন​। নেমে প​ড়েছেন বিজ্ঞানের সব শাখার​, যেমন, বায়োলজি, বায়োক্যামিস্ট্রি, বায়োফিজিক্স​, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইনজিনিয়ারিং, ইত্যাদি, সব শাখার বিজ্ঞানীরা। বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে নিরলস প্রচেস্টা চালিয়ে গেছেন দেহঘ​ড়ির নির্মাতার সঠিক পরিচ​য় বের করার লক্ষ্যে। শুধু বিজ্ঞান​  কেন  মনোজগৎ নিয়ে পৃথকভাবে চিন্তা করেন এরকম দার্শনিক মনোজগ​ৎবিদরাও বসে ছিলেন না। তারাও তাদের জগতে বসে এ দেহঘ​ড়ির কথা ভেবে ছিলেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এধরনের লেখাপ​ড়ার সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন বাংলাদেশের প্রখ্য্যাত বাউল সংগীত শিল্পী আব্দুর রহমান ব​য়াতিও দেহঘ​ড়ির কথা ভেবেছিলেন​ বহু আগে, গত শতাব্দির নব্বইর দশকে। দেহঘ​ড়ি নিয়ে  তিনি নিজে লিখে গেয়েছিলেন​- “মন আমার দেহঘ​ড়ি সন্ধান করি কোন মেস্তরি বানাইয়াছেন​”। তিনিও দেহঘ​ড়ির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে এর নির্মাতার সন্ধানে নেমেছিলেন এবং ভাববাদের উপর দাঁড়িয়ে নিজস্ব ঢঙে তারমত করে দেহঘ​ড়ির নির্মাতার ​(মেস্তরির​) পরিচ​য়ও দিয়ে গেছেন​। যৌথভাবে কাজ করে তিনজন  বিজ্ঞানী সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন এই বহুল আলোচিত দেহঘ​ড়ির নির্মাতাকেও॥দেহঘ​ড়ির নির্মাতা হিসেবে তারা " জিন ও তার নির্দেশনায় উৎপন্ন প্রোটিন​" এর সন্ধান দিয়েছেন  এবং তিনজন একত্রে গত ২ অক্টোবর​, ২০১৭ তারিখে জগ​ৎস্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন​। এই তিনজন মার্কিন বিজ্ঞানী হলেন​- জেফরি সি হল, মাইকে রোজব্যাশ, মাইকেল ডবলিউ ইয়ং॥ এরা বলেছেন​, স্বপ্রাণ জীব মাত্রই দেহঘ​ড়ির বাহক​। এরা আরো বলেছেন​, দেহঘ​ড়ি নির্মান করে ঘুম ও জাগরনের এক অনিঃশেষ চক্র​, যার ওলটপালটে বদলে যায় দেহের অনেক কিছু, যেমন​, হ্রদযন্ত্রের ক্রিয়া, বিপাক ক্রিয়া, মস্তিস্কের ক্রিয়াবলী, এবং সবশেষে বদলে যায় ​আচরন​। বিষ​য়টা তখন আর শারীরিক থাকেনা হ​য়ে যায় মানসিক​। দেহঘ​ড়ির নির্মাতার সন্ধানে নেমেছিলেন আব্দুর রহমান বয়াতি "প্রেম ন​য়নে" এবং ওটাই ছিল তার মেথডলজি। নোবেল প্রাইজ জেতা মার্কিন বিজ্ঞানী ত্র​য় যে মেথডলজি ফলো করেছেন তা নিঃসন্দেহে ছিল অতি জটিল সুক্ষ এবং বিপুল পরিমান অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট এবং কেমিক্যালস নির্ভর​। তবে একটা প​য়েন্টে ব​য়াতির সাথে এই তিনজনের প্রচন্ড মিল আছে। সেটা হলো দেখার প​য়েন্টে। অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রনিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে তারা যখন ল্যাবে রেজাল্ট দেখতেন তখন তাদের সে দেখায় কি প্রেম ছিল না? ছিল​, অবশ্যই ছিল​। কারন "প্রেম ন​য়নে" না দেখলে কোন কিছু শুদ্ধভাবে পরিপুর্ণভাবে দেখা হ​য়না আর পরিপুর্ণভাবে না দেখলে সিদ্ধি লাভ হ​য়না, সফল হওয়া যায়না। অবাক লাগে ভাবতে আব্দুর রহমান ব​য়াতি ও নোবেল প্রাইজ জেতা বিজ্ঞানী ত্র​য়ের মেথডলজিতে কি অপূর্ব মিল​! আমাদের আব্দুর রহমান ব​য়াতি বলেছেন​, "মাটির একটা কেইস বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর​।" এখন এই মেশিনের​ পরিচ​য় হিসেবে একটা জিনের কথা জানান দিয়ে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন এই তিনজন বিজ্ঞানী। আর দেহঘ​ড়ি নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমাদের আব্দুর রহমান ব​য়াতি যে যৌবন কাটিয়ে দিলেন তিনি কি পেলেন​? চিকিৎসাশাস্ত্রে দেহঘ​ড়ির উপর নোবেল দেয়ার পর এখন এটা নিয়ে বিশ্বব্যপি কত সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হবে, আরো কত চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে, কত মন্তব্য আসবে! আচ্ছা, এসবের মধ্যে কোথাও কোন ফাঁকে একটিবারের জন্য আমাদের আব্দুর রহমান বয়াতির নামটা উচ্চারনের একটা কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়না?


ডঃ বাহারুল হক​

মতামত এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com