লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ১২৮ বার
চেতনায় প্রত্যাশা
শেখর দত্ত
বাংলারিপোর্টার.কম
মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭

‘আজকে খুব বড় সমাবেশ হচ্ছে। এই সমাবেশকে বলা হচ্ছে এটা কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, এটা হচ্ছে একটা রাষ্ট্রীয় নাগরিক সমাবেশ। এটা হচ্ছে যে বক্তব্য ৭ মার্চ দেয়া হয়েছিল, সেটা ইউনেস্কো তালিকাভুক্তি করেছে, সে জন্য এই সমাবেশ।… নাগরিক সমাবেশে অমত নেই। … তো ভালো কথা! আমি তো মনে করি যে, এটা আনন্দের কথা।’ কথাগুলো বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বিগত ১৮ নভেম্বর মওলানা ভাসানীর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ভাসানী স্মৃতি সংসদ আয়োজিত আলোচনা সভায়।


এদিকে পরদিন ১৯ নভেম্বর তারেক রহমানের জন্মদিন পালন উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘১২ নভেম্বর বিএনপির যে সমাবেশ হয়েছে তার চারভাগের একভাগ লোক হয়েছে আওয়ামী লীগের নাগরিক সমাবেশে। আর ৭ মার্চের ভাষণ ঐতিহাসিক। এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভে আমাদের হিংসার কিছু নেই। একাত্তরের ৭ মার্চে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ হয়েছিল।’


বক্তব্য দুটি পাশাপাশি রেখে বিবেচনায় নিলে বুঝা যাবে, মহাসচিব ও যুগ্ম মহাসচিবের কথাবর্তায় বেশ ফারাক। একজন বললেন, খুব বড় সমাবেশ হচ্ছে আর একজন সমাবেশকে বেশ ছোট প্রমাণ করতে চাইলেন। একজন বললেন রাষ্ট্রীয় নাগরিক সমাবেশ আর আরেকজন বললেন আওয়ামী লীগের নাগরিক সমাবেশ। একজন ভাষণ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলেন আর অন্যজন হিংসা ঢাকতে চাইলেন। এ ধরনের বিপরীতধর্মী উল্টাপাল্টা ভাষণ বিএনপি নেতারা অনবরত দিয়ে যাচ্ছেন। এটা আসলে কিসের লক্ষণ! সবারই জানা যে, কেউ যখন শনিরদশায় পড়ে হতবুদ্ধি হয়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন উল্টাপাল্টা কথা বলে। বিএনপি আসলে শনিরদশায় পড়েছে। আম-ছালা সব গেছে। বিএনপি ক্ষমতায় নেই নয় বছর হলো। আর বিরোধী দলেও নেই চার বছর। ক্ষমতার সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া দলটি আন্দোলন-সংগ্রামও করতে পারে না। ক্ষমতার মসনদও সামনে দেখা যাচ্ছে না। দলের ঐক্য রক্ষাও সমস্যা। এই অবস্থায় ‘পাগল ও শিশুর’ মতো উল্টাপাল্টা বলবে না তো কী বলবেন তারা!


সর্বোপরি বাঙালির গৌরবমণ্ডিত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গ উঠলে বিএনপি যায় ভড়কে। কারণ মিথ্যা বিকৃত ও নিজেদের বানানো জোড়াতালি দেয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে ‘মুক্তিযোদ্ধার দল’ বলে পরিচিতি নিতে আগ্রহী বিএনপি দলটি। এদিকে আবার দলের ভাবাদর্শগত ভিত্তি করেছে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাতিলকৃত ও পরিত্যক্ত পাকিস্তানের ভাবাদর্শ ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’কে। কেবল দল করতে পারমিশন দেয়াই নয়, সঙ্গে রেখেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ঘাতক-রাজাকার আলবদর-আলশামস বাহিনীর দল জামায়াতকে। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উৎস থেকে সরিয়ে আনতে ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করতে সর্বক্ষণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমান বিশ^ পরিস্থিতির ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানকে ব্যবহার করে দেশকে সাম্প্রদায়িক হানাহানির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশকে ক্রমে দক্ষিণমুখী করে রাখা ও করাটাই হচ্ছে দলটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।


কিন্তু এটাই বাস্তব সত্য যে, ইতিহাসকে বিকৃত ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাধ্য করো নেই। মানবজাতি অগ্রযাত্রার ভেতর দিয়ে অলঙ্ঘনীয়ভাবে ইতিহাসকে যথার্থ স্থানে প্রতিস্থাপন করে। মিথ্যা বিকৃত বানানো ইতিহাসকে করে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ। বলাই বাহুল্য, বাঙালি জাতি সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে এই মানচিত্রে স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে। একদিকে অপরিসীম দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বীরত্ব, সাহস প্রভৃতি আর অন্যদিকে সীমাহীন রক্তত্যাগ মা-বোনের ইজ্জত দিয়ে এই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই সংগ্রামের মহান নেতা ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেবল বাঙালির ইতিহাসে নয়, বিশ্ব ইতিহাসে যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নিঃসন্দেহে এরই স্বীকৃতি হচ্ছে, আমাদের জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়া। এই মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ায় বিএনপির যে হিংসা হচ্ছে তা গয়েশ্বর রায়ের ভাষণই প্রমাণ। ওই হিংসা ঢাকতেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা হচ্ছে আনন্দের কথা। সহজেই ধারণা করা যায়, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিএনপিকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। আনন্দ বাস্তবে হিংসাকে ঢাকতে পারছে না।


বিএনপির কখনো লাজলজ্জার কোনো বালাই ছিল না। আসলে ‘পাগল ও শিশুর’ তা থাকে না। প্রসঙ্গত বলি, ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনীর উর্দি পরে জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সর্বপ্রথম জনসভার ভাষণে বলেছিলেন যে, তিনি ‘শ্রমিক’। ওই ভাষণটি বামপন্থীদের এমনই বিভ্রান্ত করেছিল যে, তখনকার চীনপন্থীরা জিয়াকে সমর্থন করেছিল এবং কেউ কেউ দলে বা জোটেও যোগ দিয়েছিল। আর রুশপন্থীরা দলের মেজরিটি দিয়ে প্রস্তাব পাস করেছিল, জিয়া ‘সীমাবদ্ধভাবে দেশপ্রেমিক’। কখনো হবে না, তবু বলি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওই বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী দ্বিধাবিভক্তকারী ভাষণ যদি আজ কোনো কারণে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মান পায়, তবে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা কি তখন আনন্দ কথাটি মুখে আনবে? একেবারেই আনবে না। কেননা আওয়ামী লীগের শিকড় শক্ত। কৌশলের কারণে কখনো এদিক ওদিক বামে ডানে টললেও গোড়া নড়বে না। কিন্তু বিএনপি নড়ে যায় প্রতিক্ষণে। কারণ এই দলের শিকড়ের কোনো ভিত্তি নেই। দলটির মূলে ভিত্তি হচ্ছে, যেনতেন প্রকারে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। পাকিস্তানি ভ‚তকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। সবটা না পারলেও এই প্রশ্নে অন্তত জাতিকে বিভক্ত করে রাখা।


উল্লিখিত কথাটা যে সত্য তা হৃদয়াঙ্গম করতে আমাদের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। প্রসঙ্গত বলি, বিজয়ী জাতি সব সময় ইতিহাসকে সঙ্গে রাখে শিকড় থেকে প্রাণরস আহরণ করে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য। ইতিহাসকে করে অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে সর্বতোভাবে তা করতে পারছি না। বিএনপি বা পরাজিত শত্রুরা তা করতে না দিতে নীলনকশা কার্যকর করছে। জাতি হিসেবে আমাদের যাতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, বাধাবিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়, তাই ইতিহাসকে করে রাখছে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর। যাতে জাতিকে কেবল পশ্চাৎমুখী হতে হয়। অতীত নিয়েই কেবল বিতর্ক করতে হয়। অনুপ্রেরণার সবটা যাতে জাতির প্রাণে জাগরণ সৃষ্টি না করতে পারে। এমনটা যদি না হতো তবে ইতিহাস যা বলে, তাতে ওই ভাষণ নিয়ে বিএনপি আদৌ বিতর্ক বাধাতে যেত না। মীমাংসিত বিষয়কে অমীমাংসিত করে তুলত না।


‘একটি জাতির জন্ম’ শিরোনামে ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় জিয়াউর রহমান লিখেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণই ছিল তার স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রেরণা। তিনি লিখেছেন, ‘তারপর এলো ১ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন।’ তারপর তিনি লিখেছেন, ‘৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল মনে হলো।’ আর এটা তো সত্য যে, তিনি বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন আর পক্ষে মিছিল যে করেছিলেন তার ছবিও রয়েছে। এই লেখাতেই তো রয়েছে ইতিহাসের ফয়সালা। কিন্তু উচ্চাকাক্সক্ষা ও ক্ষমতার জন্য মিথ্যা ইতিহাস ও পরাজিত ভাবাদর্শের ভিত্তিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন রাজনৈতিক দল বিএনপি।


তবে ক্ষমতায় থাকতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে চ্যালেঞ্জ করে ইতিহাস রচনা করার অপচেষ্টায় যাননি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মুখোশ তখন তিনি পরতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে মুখোশ মুখের সবটা ঢাকতে পারেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল করা যাবে না বলে সামরিক ফরমান জারি করেছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ৭ নভেম্বরকে করতে চেয়েছিলেন রুশ-ভারতের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার দিবস, সিপাহি জনতার বিপ্লব দিবস। প্রকৃত বিচারে যা শুরু করেছিল খুনি মোশতাক ও ফারুক-রশীদ গং, তখনকার পরিস্থিতিতে তারই বাস্তবসম্মত রূপ দেন জিয়াউর রহমান। ফারুক-রশীদকে ক্ষমতায় এসে পুরস্কৃত করে জিয়াউর রহমান প্রমাণ রাখেন, তিনিই তাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও নীলনকশার প্রকৃত বেনিফিসিয়ারি।


সেই থেকেই শুরু ইতিহাসকে মিথ্যা বিকৃত বিতর্কিত করার অপচেষ্টা, যা হাতে ক্ষমতা থাকায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ কথা কার না জানা যে, এক মিথ্যা ডেকে আনে আরো আরো মিথ্যা। এক বিকৃতি ঠেলে দেয় আরো কারো বিকৃতির দিকে। তাই বলা যায় মিথ্যা ও বিকৃতির জঞ্জাল জাতির চলার পথে ক্রমাগত স্তূপীকৃত করার ইতিহাস হচ্ছে বিএনপির ইতিহাস। যতটুকু মনে পড়ে ১৯৯১ সালে সংসদ চলছে। তখন সংসদ নেত্রী খালেদা জিয়া তেমন উপস্থিত থাকতেন না। উপনেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী কথার পিঠে কথা বলতে গিয়ে বললেন যে, স্বাধীনতার ঘোষণা তো তিনিই দিয়েছেন, আপনারা কেন দিতে পারেননি। এই কথাটা আওয়ামী লীগবিরোধী মহল লুফে নেয়। সেই থেকেই ক্রমে এই বিকৃত ও মিথ্যা কথাটি প্রচারিত হতে থাকে। একজন মেজর, যিনি পাকিস্তানের মিলিটারি অফিসার হিসেবে চট্টগ্রাম যান এবং ঘটনাচক্রে কালুরঘাট বেতারে বঙ্গবন্ধুর নামে বক্তৃতা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি সেক্টরের অধিনায়ক হন, তিনি বনে যান ‘স্বাধীনতার ঘোষক’।


এই কথাটি প্রমাণ করতে বিএনপি ইতিহাসকে মিথ্যার পাহাড়ে চাপা দিতে উদ্যত হয়। এ ক্ষেত্রে জাতির দুর্ভাগ্য হচ্ছে, এই বিকৃতিতে যিনি নেতৃত্ব দেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। স্বামীর ইচ্ছায় ভারতে না গিয়ে ছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যান্টনম্যান্টের বাসায়। ওই সময়ের কিচ্ছাকাহিনীর কতটুক সত্য বা মিথ্যা, তা এই কলামের আদৌ বিষয়বস্তু নয়। তবে বলতেই হয়, ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ কথাটি যদি প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিচে নামিয়ে জিয়াকে ওপরে তোলা ভিন্ন বিকল্প থাকে না। যতটুকু পারা যায় করতে হবে হেয়। শুরু হয় সেই লক্ষ্যে প্রচারসহ সব প্রচেষ্টা গ্রহণ। এর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য অবতারণা হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর তিরোধান দিবস ১৫ আগস্টকে খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে উদযাপন। কেবল বাঙালির ইতিহাস নয়, বিশ্ব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ১৫ আগস্টকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন করাকে কী বলা যাবে! ওই দিন কেক কাটা তো আসলে জাতির বুকে ছুরি চালানো। সেই কাজটিই বিএনপি করেছে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে।


কেবল কি তাই! ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ কথাটি তারা ইতিহাসের অংশ করে নেয় এবং পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করে। প্রসঙ্গত বলি, কেউ কাউকে ‘রাজাকার’ বলল কিংবা কেউ কাউকে ‘বাকশালি’ বলে গালি দিল, এসব পাল্টাপাল্টি অনভিপ্রেত মনে হলেও রাজনীতিতে তা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কথা দিয়ে কাবু করা রাজনীতির অনুষঙ্গ। কিন্তু পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসে তা যুক্ত করা ভয়াবহ। এটাকে বলা যায় ইতিহাস ও কোমলমতি বালক-বালিকাদের বুকে ছুরি চালানো। এটা ক্রাইম, গর্হিত অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি আইন দিতে পারবে না। তবে সময় লাগলেও নিঃসন্দেহে তা দেবে গণআদালত। মিথ্যা ও ভ্রান্ত ইতিহাসকে শাস্তি দেয় প্রকৃত ইতিহাস। বলাই বাহুল্য এবং আশার কথা, জাতির পিতার ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হয়ে গেছে। আনন্দ প্রকাশ বা হিংসা প্রকাশ করা হচ্ছে কি সাধে! একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি।


বাবাজি অবশ্য ইতিহাস বিকৃতি ও মিথ্যা প্রচারে মায়ের চেয়ে আছে অনেক দূর এগিয়ে। প্রবাদ বলে, নুন খাই যার গুণ গাই তার। আর তখন তো বালক হিসেবে হানাদার বাহিনীর বাড়িতে দুধও খেয়েছেন তারেক জিয়া। ছোটবেলায় হানাদার বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টের বাসায় নুন ও দুধ খাওয়ার প্রতিদান দিতেই হয়। তাই না! মা খালেদা জিয়া পাকিস্তানিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ২০১৫ সালে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। আর বাবাজি সংখ্যা নিয়ে কেবল বিতর্কের মধ্যেই থাকলেন না। তিনি বলে দিলেন, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন তার পিতা জিয়াউর রহমান। সেন্ট যোসেফ স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যে ছেলেটি টেনেটুনে এসএসপি পাস করেছে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায় না, সেই বাবাজি ইতিহাস সম্পর্কে দেয় জাতিকে শিক্ষা। আর এটা গ্রহণ করে বিএনপির শিক্ষিত নেতারাসহ থিংকট্যাঙ্কের জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিজীবীরা। দেশের বড় এক অংশের জনগণের নেতা হিসেবে কোন মানসম্মত মস্তিষ্কের ব্যক্তি নেতা হয়েছেন, তা কি কল্পনা করা যায়! মেধাহীন নেতৃত্ব হচ্ছে কেবল জাতির নয় দলের বোঝাস্বরূপ, কলঙ্কবিশেষ। দলকে এমন নেতা অন্ধত্ব ও সুবিধাবাদের চোরাবালির দিকে ঠেলে দেয়। আর চোরাবালি মানেই হচ্ছে তল না পাওয়া। পাগল ও শিশুর মতো আবোল-তাবোল বলা। যেমনটা আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সব বিএনপির নেতারাই ইতিহাস নিয়ে বলছেন।


ধারণা করি ভেতরে ভেতরে হিংসায় জ্বলেপুড়ে গিয়ে বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক গয়েশ্বর রায় ৭ মার্চের জনসভায় কত মানুষের সমাগম হয়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক তুলতে চাইছেন। দেড় না দশ লাখ হয়েছিল, তা তখনকার পত্রিকা দেখলেই জানা যাবে। তবে সংখ্যায় যতই থাকুক বিএনপির ‘আত্মার আত্মীয়’ জামায়াতসহ পাকিস্তানের দালালরা বাদে বাংলাদেশের সব মানুষের মন পড়ে ছিল ওই ময়দানে। জাতির গৌরবময় উত্থানের ওই দিনে সবাই কান পেতে রেখেছিল ওই ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে রেডিওতে। যে বক্তৃতা শুনে এক মুজিব লক্ষ লক্ষ মুজিব হিসেবে গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই বক্তৃতাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা কি আসলে জাতি সইবে! জাতির কোনো কুলাঙ্গার ছাড়া এমন বিকৃতি কি কেউ করতে পারে ইতিহাসের।


আর আনন্দ প্রকাশ করেও পার পেয়ে যেতে পারেন না মির্জা ফখরুল। সত্তরের নির্বাচন যখন হয় তখন তিনি চীনপন্থী হিসেবে নির্বাচন বয়কটপন্থী ছিলেন। স্লোগান তুলেছিলেন, ‘তোরা কর নির্বাচন/আমরা যাই সুন্দরবন।’ জাতীয় মূলধারার রাজনীতির পূর্বাপর বিরোধিতা করেছেন এই ব্যক্তিটি। সুন্দর চেহারা আর মিষ্টি কথায় বিভ্রান্তি ছড়াতে লোকটি আসলেই ওস্তাদ। প্রশ্ন হলো, বারবার কি ঘুঘু ধান খেয়ে যাবে? জাতির একাংশ কি সব সময়েই মিথ্যা ও বিকৃত ইতিহাসের মধ্যে থাকবে? মনে হয় না। তবে জাতীয় মূলধারার রাজনীতি ও সংগঠন শক্তি যত দিন না দুর্বলতা সীমাবদ্ধতা মন্দ কাজ কাটিয়ে ওঠে কিংবা ন্যূনতমভাবে পদানত না করে দেশের মানুষের হৃদয়মন জয় করতে সক্ষম হবে, ততদিন এসব ঘুঘুরা বহাল তবিয়তে রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারবে বলেই ৪৬তম বিজয়ের মাসকে সামনে রেখে মনে হচ্ছে।


শেখর দত্ত: রাজনীতিক, কলাম লেখক

মতামত এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com