লগ-ইন ¦ নিবন্ধিত হোন
 ইউনিজয়   ফনেটিক   English 
নদী দখলকারীরা যত শক্তিশালী হোক, তাদের ১৩ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার কি আদৌ তা পারবে?
হ্যাঁ না মন্তব্য নেই
------------------------
নিউজটি পড়া হয়েছে ৫৩১ বার
যশোর সীমান্ত দিয়ে হরহামেশাই দেশে আসছে অবৈধ অস্ত্র
দেশের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে। সীমান্ত অঞ্চলে খুব একটা ধরা না পড়লেও শহর ও আশপাশ থেকে প্রায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের খবর জানায়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, চোরাচালান হয়ে আসা অস্ত্রের তুলনায় আটক হওয়া অস্ত্রের পরিমাণ অনেক কম। চোরাচালানে আসা অবৈধ অস্ত্রের খুব কমই যশোরে থাকে। তারপরও যে পরিমাণ অস্ত্র থেকে যায়, তাই যশোরকে মাঝে মধ্যে অশান্ত করে রাখে। অবৈধ অস্ত্রধারীরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া চালায়, করে গুপ্ত খুন। সীমান্তে অন্য অনেক চোরাচালান পণ্য আটক হলেও অস্ত্র খুব একটা ধরা পড়ে না বলে স্বীকার করলেন ২৬ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মতিউর রহমান। তিনি বলেন, অস্ত্র চোরাচালানকারীরা সাধারণত একসঙ্গে ১-২টার বেশি অস্ত্র বহন করে না। ফলে সীমান্তের যেকোনো দিক দিয়েই আসা-যাওয়া সহজেই করতে পারে তারা।

নির্ভরযোগ্য এক সূত্রে জানা যায়, কেবল গত মার্চ মাসেই ৪০টি বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে নাইন এমএম পিস্তল, রিভলবার, শুটারগান, শাটারগান, পাইপগান ও এয়ারগান রয়েছে।

র‌্যাবের যশোর ক্যাম্পের উপ-পরিচালক মেজর মাসুদ জানান, অবৈধ অস্ত্রসহ যারা ধরা পড়ে তারাও আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যায়।

জেলার চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ৯১.৬ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত ভারতীয় সীমান্ত। এ সীমান্তে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি চোরাই ঘাট রয়েছে। এসব চোরাই ঘাট দিয়ে রাত-দিন সমান তালে অস্ত্রসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য এপার-ওপার হচ্ছে। এসব চোরাচালান ঘাটগুলো হচ্ছে শার্শার বাগআঁচড়া, জামতলা, ভুলোট, গোগা, লক্ষণপুর, শালকোনা, পাকশিয়া ও কাশীপুর বেনাপোলের পুটখালী, বারপোতা, তেরঘর, দৌলতপুর, গাতিপাড়া, বড়আঁচড়া, সাদীপুর, রঘুনাথপুর, ধান্যখোলা ও ঘিবা অন্যতম। কথিত আছে সীমান্তে ভারতীয় গরু প্রবেশের করিডোর থাকায় গরু ব্যবসায়ী ও রাখালদের এপার-ওপার হওয়া তেমন একটা সন্দেহ করে না বিজিবি। এ সুযোগে এসব গরুর রাখাল ও ব্যবসায়ীরা আকারে ছোট সহজে বহনযোগ্য ও বেশি লাভ হওয়ায় অবৈধ অস্ত্র পারাপার করে থাকে।

জানা যায়, যশোরে অস্ত্রের বাজার আছে এ কথাটা এখানে বেশ আলোচিত। তবে এই বাজারে কিভাবে কেনাবেচা হয়, তা জানা নেই বেশিরভাগ মানুষের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত দালালরা ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়। বিক্রেতারা মাল দেয়ার আগেই টাকা আদায় করে নেয়। হয়তো তারা যশোর শহরের কোনো এলাকায় টাকাটা নেবে। টাকা নেয়ার পর শহরের বাইরের কোনো এলাকা থেকে অস্ত্রটি সংগ্রহ করতে বলবে, সেটা হতে পারে শার্শা, ঝিকরগাছা বা চৌগাছার কোনো এলাকা। আজকাল অবশ্য হাতে হাতে টাকা নেয়ার বদলে বিকাশ বা অন্যান্য মাধ্যমেও নিচ্ছে। ক্রেতা নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে অপেক্ষা করতে শুরু করলে হঠাৎ একটা ফোন পেতে পারে। ফোনে তাকে হয়তো আরো ১০০ গজ সামনে গিয়ে বটগাছতলায় দাঁড়াতে বলা হবে। বটতলায় দাঁড়ালে আবার ফোন আসবে

এবং এবার ক্রেতাকে বলা হবে, ডানে তাকিয়ে রাস্তার পাশের কচুগাছগুলো দেখেন। ভালো করে দেখেন, একটা কচুর পাতা ভাঙা আছে, পাতার নিচে হাত দিন।

এ ছাড়া অনেক সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ক্রেতারা গোপনে অস্ত্র দেখে মূল্য নির্ধারণ করার পর ব্যবসায়ীরা ছোট চালের বস্তা বা বিভিন্ন ফলের কার্টনের মধ্যে অথবা অভিনব কায়দায় অস্ত্র লুকিয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নির্বিঘেœ।

সূত্র আরো জানায়, পুলিশের নজর ফাঁকি দেয়ার জন্য এসব অস্ত্র বহনের কাজে একজন ব্যক্তিকে মাসে একবারের বেশি ব্যবহার করা হয় না। আর অস্ত্র বহনকারী রকম ভেদে মজুরি পেয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানের ক্রেতাদের সঙ্গে দর-দাম ঠিক হওয়ার পর ওই অস্ত্রটি চালের বস্তা অথবা অন্যকিছুর মধ্যে ভরে বাস ছাড়ার মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে বাসের লাগেজ বক্সে তুলে দেয়া হয়।

গত বছরে শেষ সময়ে জেলার নাভারনের বাস কাউন্টার থেকে বিজিবি চালের বস্তার ভেতর থেকে ৩টি বিদেশী পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে। এর কিছুদিন আগে ট্রেন থেকেও দু-দুবার এ ধরনের পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে বিজিবি যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। যশোর ও বেনাপোল থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলো পথিমধ্যে দু-এক জায়গায় চেকিং হলেও লাগেজ বক্সটি তেমন চেকিং না হওয়ায় অস্ত্রটি নির্বিঘেœœ ঢাকা বা দেশের অন্যত্র পৌঁছে যাচ্ছে।

র‌্যাবের যশোর ক্যাম্পের উপ-পরিচালক মেজর মাসুদ বলেন, র‌্যাব প্রায় ক্রেতাকে অনুসরণ করে অস্ত্র বিক্রেতাদের ধরার চেষ্টা করে। আর তাই ক্রেতার হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার সময় বিক্রেতারা এমন অভিনব অনেক নানা কৌশল গ্রহণ করছে।

যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, ক্রেতার কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিতে আসে যারা, তারা ধরা পড়লেও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের হদিস জানা যায় না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসের একদিন বেনাপোল থেকে আসা একটি বাসে রুটিন চেক করতে গিয়ে একটি নাইন এমএম পিস্তল, চারটি গুলিসহ এক নারীকে আটক করার কথা। পরে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় ওই নারী পিস্তলটির বাহকমাত্র। ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ তার পরিচিত নয়।

র‌্যাব-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্রবাজদের সহযোগীর কেউ কেউ আটক হলেও রাঘব বোয়ালরা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি সঠিক পন্থায় অস্ত্রসহ আটককৃতদের মামলাগুলো তদন্ত করতে পারে তাহলে এ চক্রের রাঘব বোয়ালদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে এলাকাবাসীর অভিমত। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চেষ্টা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো খবর মেলেনি। এ ছাড়া পাতি নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও উপদলীয় কোন্দলে অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষ ও বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করতে অবৈধ অস্ত্র আমদানি করছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সীমান্তের অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে এ ব্যবসা জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রে ইউএসএ ও ইতালি লেখা নাইন এমএম পিস্তলসহ নানান কিসিমের ছোট অস্ত্র ও গুলি দেখা গেছে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) যশোর জেলা শাখার সভাপতি আবু সালেহ তোতা বলেন, দেশের অন্য সব জেলা শহরের তুলনায় যশোরের সন্ত্রাসীরা অনেক বেশি সশস্ত্র। প্রায়ই এখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যায়। সারা দেশের মতো যশোরেও অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এ কাজ করেন। অস্ত্রধারীরাও ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা চালানোর কাজে রাজনীতিবিদদের ব্যবহার করে।

অবশ্য এ ব্যাপারে যশোর জেলা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা জানিয়েছেন, অস্ত্রবাজদের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই।

এ বিষয়ে যশোরের এএসপি ‘ক’ সার্কেল মিলু বিশ্বাস জানান, পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টির প্রতি কড়া নজর রাখছে। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাহক এবং ক্রেতাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাতেনাতে আটক করছে। তিনি আরো জানান, সীমান্ত থেকে খুব ছোট চালানগুলো বাস ও মোটরসাইকেলযোগে বহনযোগ্য হওয়ায় এসব অবৈধ অস্ত্র বহনকারীরা সহজে দেশের ভেতর প্রবেশ করাতে সক্ষম হচ্ছে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে চক্রগুলোকে চিহ্নিত করতে সচেষ্ট রয়েছে।
খুলনা বিভাগ এর অন্যান্য খবর
Editor: Syed Rahman, Executive Editor: Jashim Uddin, Publisher: Ashraf Hassan
Mailing address: 2768 Danforth Avenue Toronto ON   M4C 1L7, Canada
Telephone: 647 467 5652  Email: editor@banglareporter.com, syedrahman1971@gmail.com