একজন দর্শকের দৃষ্টিতে আমাদের ক্রিকেট
আবু আহমেদ
বাংলারিপোর্টার.কম
সোমবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৭

ক্রিকেট খেলাটাকেই আমি মনোযোগ দিয়ে দেখি, আর সেটা যদি বাংলাদেশ বনাম অন্য দেশ হয়, তাহলে তো কথাই নেই। আজকাল রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকি না।


তবে বাংলাদেশ বনাম অন্যদের ক্রিকেট খেলা হলে জাগ্রত থাকতে যেন কোনো অসুবিধা হয় না। ক্রিজে সেট হওয়া বলে একটা কথা আছে। সেট হতে গিয়ে বড় ক্রিকেটারও মারার মতো প্রথম কয়েকটা বল ছেড়ে দেন। আবার ছেড়ে দিতে গিয়ে গালিতে অনেকে ক্যাচ দিয়েও বসেন, না হয় এলবির ফাঁদে পড়েন। আবার কিছুসংখ্যক ক্রিকেট প্লেয়ার আছেন তাঁরা প্রথম বল থেকেই মারা শুরু করেন। বিশেষ করে খেলাটা যদি ওডিআই অথবা টি-টোয়েন্টি হয়। যেটা আমি বুঝি সেটা হলো, প্রত্যেকেরই একটা স্টাইল আছে। নিজস্ব স্টাইল থেকে দূরে গিয়ে খেলতে গেলে কেউ ভালো করেছে বলে আমার জানা নেই। তামিম ইকবাল কখন ক্রিজে সেট হবেন সে নিয়ে আশায় বুক বেঁধে থাকতাম। ভাবতাম তিনি সেট হয়ে গেলে আমাদের ইনিংসটা লম্বা হবে। আবার কখন সৌম্য তাঁর নিজস্ব স্টাইলে বলকে মাঠের বাইরে পাঠাবেন এ নিয়ে উচ্ছ্বসিত থাকতাম। মাঝেমধ্যে সৌম্যর খেলা পড়ে যাওয়ায় দুঃখ পেতাম। এখন সৌম্যর অবস্থান হয়েছে গড়েরও নিচে।


যখন টেস্ট হয় তখন আমাদের ক্রিকেটবোদ্ধারা বলেন, অন্তত দু-একটি জুটিকে লম্বা ইনিংস খেলতে হবে। প্রথম ইনিংসই দেড় দিন খেলতে হবে। কিন্তু যখন দেখি আমাদের ক্রিকেটাররা ওডিআই থেকেও খারাপ করছেন, তখন হতাশ হই। দেড় দিনের বদলে শুধু এক দিনেই প্রথম ইনিংস শেষ! মনটা খারাপ হয়ে যায়। প্রথম ইনিংসে রানের পরিমাণ অনেক পিছিয়ে পড়লে পরাজয়টাও যেন নিশ্চিত হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ ইনিংস ডিফিটের সম্মুখীন হয়। তাতেও দুঃখ ছিল না, কিন্তু পরাজয়টা ইনিংস এবং অনেক বেশি রানের ব্যবধানের ছিল, যা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরেকটি রেকর্ড। ওয়ানডে বা ওডিআইতেও একই অবস্থা। একক প্লেয়ার ডি ভিলিয়ার্স একাই ১৭৬ রান। এরপর আমাদের আর কী আশা থাকল। আমরা ওয়ানডে খেলায়ও রেকর্ড ব্যবধানে পরাজিত হলাম। সামনে আছে একটি টি-টোয়েন্টি। আশা তো এই যে অন্তত সে ক্ষেত্রে আমাদের হারের ব্যবধানটা কম থাকবে, যদি পারি।

 
বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে অনেক আশা করে। পারলে আমরা এখানেই পারব। অন্য খেলা আমাদের থেকে অনেক দূরে। কয়েক বছর আগে আমি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। একজন ফুটবল প্লেয়ার কাম-বোদ্ধা আমাকে দেখে বললেন, আমাদের সম্ভাবনা আছে ক্রিকেটে। ফুটবলে মোটেও নেই। কারণ হলো, আমরা শারীরিক শক্তিতে ফুটবলের জন্য উপযুক্ত নই। তিনি এও বললেন, ক্রিকেট খেলতে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয় না। এই খেলায় ছোট গড়নের ছেলেরাও ভালো করতে পারে। ক্রিকেট মূলত প্র্যাকটিসের এবং স্কিলের খেলা। তাঁর কথার সঙ্গে আমিও সায় দিলাম। আর বাংলাদেশের ক্রিকেট এগোচ্ছে দেখে বারবার তাঁর কথাগুলো মনে পড়ছিল। তবে ক্রিকেট খেলায়ও শারীরিক শক্তি-সামর্থ্যের প্রয়োজন আছে। একেবারে হালকা-পাতলা কেউ ক্রিকেটে কি ভালো করেছে। বিশেষ করে ফাস্ট বোলিং বা পেস বোলিং করতে গেলে শারীরিক শক্তির বেশ প্রয়োজন হয়। একটা কথা আমি বলি, অন্যরা না-ও বলতে পারেন, তা হলো সফল ফাস্ট বোলার হতে গেলে লম্বা হতে হয়, শারীরিক সামর্থ্যও থাকতে হয়। এই ধারণা আমার হয়েছে বিশ্বের নামি অতীত-বর্তমানের ফাস্ট বোলারদের খেলা থেকে। যা হোক, আমার মতো লোক কে ভালো ফাস্ট বোলার হবে, কে হবে না—এ নিয়ে মতামত দেওয়াটাও একটা অযাচিত অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়।


আমি ক্রিকেট খেলা দেখি এবং এনজয় করি। নিজ দেশের টিমের জয়ে প্রফুল্ল হই। আমাদের ক্রিকেট অনেক এগিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেকেই বলছেন। আমিও মনে করি এগিয়েছে। কিন্তু দুঃখটা পাই হঠাৎ ফ্লপ করে গেলে। বাতিগুলোতে যেন হঠাৎ করেই তেল নিঃশেষ হয়ে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে আমাদের পারফরম্যান্স দেখে অনেকের মন ভেঙে গেছে। আমরা কি এতই খারাপ যে শুধু ক্রিজে আসা আর যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব! দেখে মনে হলো পুরো টিম হতাশ। একটা ভয় আর হতাশা আমাদের ক্রিকেট প্লেয়ারদের যেন পেয়ে বসেছে। তাঁদের খেলা দেখে মনে হলো, তাঁরা হারার আগেই হারার জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন। আমাদের ক্রিকেটারদের মুশকিল হলো প্রথম দুই-তিনজন ব্যর্থ হলে পরের খেলোয়াড়রা যেন অটোমেটিক ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছেন। শক্তভাবে দাঁড়ানোর মনোভাব যেন হারিয়ে যায়। আমরাও পারব, এই মনোভাবই যেন তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। আমি যতটা বুঝি, ক্রিকেট হলো আশাবাদীদের খেলা। প্রথম থেকেই কেউ যদি মনে করে আমরা পারব না, ওরা অনেক ভালো, তাহলে ব্যাটে রান আসবে না। উড়িয়ে মারতে গেলে বল মাঠের কোণে পড়ে অন্যদের হাতে ক্যাচ হয়ে যাবে। আর যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলা হয়, তাহলে সেই বলই মাঠ ছেড়ে গ্যালারিতে গিয়ে পড়বে।


গত বিশ্বকাপের কথা আজও মনে পড়ে। কী চমৎকার খেলাটাই না আমরা দেখলাম আমাদের ক্রিকেটারদের থেকে। অস্ট্রেলিয়ার এক শহরে এক টিমকে পরাজিত করে ক্রিকেট বাংলাদেশ চলেছে অন্য শহরে। সবাই বাংলাদেশ টিমকে সমীহ করছে। মাহমুদ উল্লাহ-মুস্তাফিজ তাঁরা যখন দাঁড়িয়ে যান তখন অন্য শিবিরে পরাজয়ের ভাবনা গভীর হতে থাকে। আমরা সেই সব খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছি আর ভাবছিলাম ক্রিকেট বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে, এখন আমাদের হেয় করার আর কেউ থাকবে না। চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতেও আমরা ভালো করেছি। মধ্যম মানের পারফরম্যান্স। আমরা বিনা বাছাই প্রতিযোগিতায় পরবর্তী বিশ্বকাপ খেলতে পারব। এই অর্জনই বা কম কী। কিন্তু হতাশ হই যখন হঠাৎ আমরা হারার গভীরে চলে যাই। দক্ষিণ আফ্রিকার দল অবশ্যই ভালো দল। কিন্তু তাই বলে কি আমরা প্রতিযোগিতাটাও গড়ে তুলতে পারতাম না।


আমার কাছে মনে হয়, ক্রিকেট নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। পুরনো ক্রিকেটার, যাঁরা এখন আর পারফর্ম করছেন না তাঁদের দল থেকে বাদ দেওয়াই ভালো হবে। নতুনদের দলে ঠাঁই দেওয়া দরকার। আরেকটা কথা বলব, আমাদের ক্রিকেট টিমের সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবন কিভাবে কাটে, সে খবরও ক্রিকেট বোর্ডকে রাখতে হবে। কারণ হলো শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য অনেকটা নির্ভর করে প্লেয়াররা ব্যক্তিগত জীবন কিভাবে কাটাচ্ছেন তার ওপর। তাঁরা যদি পরে উচ্ছন্নে যান, অথবা অন্য আসক্তিতে চলে যান, তাহলে তাঁদের খেলা তো পড়ে যাবে। মুশফিক দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান, অত্যন্ত খুশি লাগল দেখে যে তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্তার কাছে ওই জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আমাদের বোলারদের ব্যর্থতা আরো বেশি পীড়াদায়ক হয়েছে। মুস্তাফিজের প্রতিভার ঘাটতি ছিল না। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা যেন তাঁকে শুধুই পেছনে ঠেলে দিয়েছে। এটা তাঁর কিসমত। এটাকে মেনে যেতে হবে। তাঁর যেহেতু বয়স আছে, তাঁকে চেষ্টা করে যেতে হবে, তিনি যেন আবার কাটার মাস্টার হতে পারেন।


বিশ্ব ক্রিকেট আমাদের প্রতি অবিচার করছে। আমাদের তারা খেলা দেয় না। অস্ট্রেলিয়া এলো এক বছর দেরি করে, তাও মাত্র দুটি টেস্টের জন্য। কত বছর পর আমাদের টিম ভারতে গেল, তাও মাত্র একটি (?) টেস্ট খেলার জন্য। আমরা যদি বিদেশের মাটিতে খেলার সুযোগ না পাই, তাহলে কিভাবে বুঝব যে আমরা অন্যদের তুলনায় কোথায় আছি। বাংলাদেশ হলো অপেক্ষাকৃত ওপরের র‌্যাংকিংয়ের একমাত্র টিম, যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক কম খেলা পাচ্ছে। এমনকি আমাদের থেকে জিম্বাবুয়েও অনেক বেশি খেলছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অনেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তাদের সেই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান আজও দূর হয়নি। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড এরা মিলে যেন ক্রিকেটের এলিট বলয় গড়ে তুলেছে। অন্যদের খেলায় নিতে চায় না। পাঁচ-সাত বছর পর মাত্র কয়েক দিনের জন্য এরা বাংলাদেশকে সময় দেয়। এটা অন্যায়। আমি ক্রিকেটের কোনো বিশেষজ্ঞ নই। শুধুই একজন খেলাপ্রেমিক। তাও বাংলাদেশ খেললে বেশি প্রেমিক।


লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়