বিশ্বসুন্দরী ও বাংলাদেশ
দাউদ হায়দার
বাংলারিপোর্টার.কম
শনিবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৭

দেখিনি, পুরাণে পড়েছি, মেনকা-উর্বশী-রম্ভা প্রমুখ অতীব খুবসুরত, গা গতরে-চামড়ায় চকচকে, টলমলে-ঢলঢলে যৌবন, সর্বদা যুবতী। তাদের বয়স হয় না, নয়ন-বদন স্থবির পাথরও উচ্ছ্বল। কেশ বিন্যাসে, মিহিন কেশকে প্রকৃতিও দিশেহারা। চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্র মায়া গোটা সৌরজগৎ কম্পিত। ‘সুন্দরী লো সুন্দরী কোন মুখে তোর গুণ ধরি’।


তো, সুন্দরী দেখে কে না মোহিত, বিচলিত, কুপোকাত? দেবরাজ ইন্দ্রের কথা ছেড়েই দিলুম, ভয়ঙ্কর রাগী ঋষি দুর্বাসার নামে দেবতারাও কম্পমান, ধ্যানে বসে। মেনকা সুন্দরীকে দেখে তারও চিত্তহারা, ব্যাকুল। কিসের ধ্যান-ট্যান। মেনকার গর্ভে দুর্বাসার ঔরসে শকুন্তলার জন্ম। শকুন্তলা এমনই রুপবতী দৌদণ্ডপ্রতাপ রাজা দুষ্মন্ত দেখামাত্রই কাবু। ক্লান্তি, খুৎ পিপাসা নিমেষে উধাও। শকুন্তলা-দুষ্মন্তের পুত্র ভরত। এরই নামে ভারত (ভারতবর্ষ)।


কে স্বর্গমত্যের সুন্দরী? পুরাণে আছে দেবতারা বিচারক, নির্ধারক। একালের দেবতারা মানুষ নামধারী। কেবল দেবতা হলে চলবে না খাঁটি ব্যবসায়ী হওয়া চাই। যে সে ব্যবসায়ী নয়, বিশ্বব্যাপী কসমেটিকস, ফ্যাশন তথা পোশাক-আশাকের ব্যবসায়ী। কসমেটিকস, নানা ডিজাইনের পোশাক যদি সস্তা হয়, কম পয়সায় বিক্রি হলে ব্যবসা লাটে উঠবে। দামি কসমেটিকস, ডিজাইনের দামি পোশাক ক্রেতা কারা। নিশ্চয় গরিবরা নয় এবং বাহুল্য বলা দরিদ্র দেশে, জনসংখ্যা কম দেশে দামি কসমেটিক, দামি পোশাকের বাজার রমরমা নয়। বিক্রি সামান্য। বিজ্ঞাপন-প্রচারণায় লোকসান। যেমন তৃতীয় বিশ্বে, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কিংবা সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রিত দেশে। দেশীয় প্রসাধন, ফ্যাশনই দুস্তর।


সুন্দরী কাকে বলে, সুন্দরীর সংজ্ঞা কী? ‘চুল তার অন্ধকার বিদিশার দিশা?’ ‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য?’ ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ?’


বছর কয়েক আগে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়ারভানে গিয়েছিলাম, সাহিত্য উৎসবে, পদ্য পড়তে, বক্তৃতা দিতে। আর্মেনিয়ার সঙ্গে আমাদের দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতি-ইতিহাসের সম্পর্ক আছে। ঢাকায় আর্মানিটোলা। আর্মানি গিজা, একসময় বহু আর্মেনিয়ান ঢাকায় এবং অন্যান্য জেলায় আস্তানা গেড়েছিলেন। পুরনো কালের কলকাতায় আরও। থাক ইতিহাস।


সাহিত্য উৎসবের প্রথম সন্ধ্যায়, শুরুতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তাও আবার পশ্চিমা ধ্রুপদী মিউজিকের।


সোসে সেডরাকিয়ান, বয়স পঁচিশের কম বা বেশি (নারীর বয়স বোঝা দায়!), বিটোফেনের পঞ্চম সিম্ফনি বাজালেন ভায়োলিনে। বাংলায় কথা আছে ‘শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ’ নয়। প্রত্যেকেই তাকিয়ে তার দিকে। এমন সুন্দরীও হতে পারে?


পুরাণে আছে, ব্রক্ষ্মার আদেশে পৃথিবীর সব সৌন্দর্যের তিল তিল নিয়ে তিলত্তমা-সুন্দরী গড়েছিলেন বিশ্বকর্মা। ওই তিলোত্তমাকে দেখিনি। যদি দেখতাম, রুপ বিচারে সোসের কাছে ‘বাঁদরী’ (রামায়নে বাল্মীকি যেমন বলছেন মন্থরাকে)।


যা হয় বুড়োর ভীমরতি। বাদন শুনেই মায়ায় উদ্বেল। ফল ইন লাভ। ‘প্রেমে পতন’ (বিষ্ণু দে’র অনুবাদ)।


সোসে বললেন, “আর্মেনিয়ান ভাষায় ‘সোসে’ মানে সুন্দরীপত্র, সুপর্ণা। -সেডরাকিয়ান বংশপদবী।”


ইতালিয়ান প্রবাদ, ‘পরমাসুন্দরী সান্নিধ্য সুখকর নয়, মাথার ঘিলু বিগড়ে যায়।’ সটকে পড়লাম।


সোসে যদি বিশ্বসুন্দরী নন আর কে?


না, তিনি নন, হতে পারেন না। যেমন পারেন না আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান এমন কী কাশ্মিরের (ভারতের বা পাকিস্তানের), নেপাল। বাংলাদেশের। আরবদেশের। ইরানের। তুর্কির। আফ্রিকার। ল্যাটিন আমেরিকার ছোট, গরিব দেশের। কারণ একটিই, ব্যবসা।


কসমেটিকস ব্যবসায়ীরাই ঠিক করে কোন দেশকে বেছে নেবে ব্যবসায় সুন্দরী নির্বাচনে। সুন্দরী নয় মূল ব্যবসা। কসমেটিকস, পোশাক বিক্রি। গত ১৭ বছরে ভারতের ৬ সুন্দরীকে কেন বেছে নিচ্ছে? – ভারত বিশাল বাজার। ধনী দেশের তালিকা। উদ্দেশ্য, সুন্দরীর খেতাব পরিয়ে কসমেটিকস বিক্রি। শাশ্বতী সেন, ঐশ্বরিয়া, প্রিয়াঙ্কাকে নির্বাচন করে কম ব্যবসা করেছে লো’রেল ইত্যাদি কোম্পানি? ইরানে বা মধ্যপ্রাচ্যে, আরব দেশে আফ্রিকায় কোনও সুন্দরী নেই?


থাকলেও ব্যবসা হবে না। চাই এমন দেশ, ‘সুন্দরী’র নামে ব্যবসা। বড়ো দেশ। উঠতি ধনী দেশ। ইদানীং ভারত। ব্রাজিল।


লক্ষ্য করুন, ধনী জাপান, দক্ষিণ থেকে বিশ্বসুন্দরীর নির্বাচন করা হচ্ছে না। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড থেকে নয়। এশিয়ার ছোট, গরিব দেশ, জনসংখ্যায় কম দেশ থেকে নয়। রাশিয়া থেকে নয়। এসব দেশে ব্যবসা অচল।


লক্ষ্য করুন, গত দুই যুগে, ইউরোপের নামী কসমেটিকস ব্যবসায়ীরা ইউরোপের কোনও দেশের সুন্দরীকে নির্বাচিত করেনি। কারণ, ইউরোপের কসমেটিকস প্রোডাক্ট ইউরোপের নানা দেশে, নানা ঘরে ইইউ’র (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন) ব্যবসায়, বাজারে। একই ব্রান্ডে নিজ দেশে (ইউরোপের নানা দেশে) প্রোডাক্টস। ইউরোপে ‘বিশ্বসুন্দরী’ দরকার নেই। দরকার কোন দেশের বাজার উদ্বেলিত। ভারত বড় বাজার। বাংলাদেশ নয়। বিশ্বসুন্দরীর ‘ব্যবসায়’ ভারতকেই কসমেটিকস ব্যবসায়ী, পোশাক ব্যবসায়ী তথা নব্য ধনী দেশকেই বেছে নেবে, স্বাভাবিক। দুঃখের কিছু নেই ভারত যখন ধনী দেশ, ধনীর তালিকায় ছিল না, কোনও কসমেটিক কোম্পানি ভারতকে বেছে নেয়নি। এখন নেওয়ার বদমাইশি কেবল ব্যবসা নয় রাজনীতিও।


পুরাণের সুন্দরী কেবল পুরানের দেবতা, মুনি-ঋষির চোখেই নয়, একালের কসমেটিক ব্যবসায়ীর চোখে। কে সুন্দরী, কে নয়। কে কোন দেশের। বাংলাদেশের কেউ কি অপ্সরা হওয়ার যোগ্য? বাংলাদেশ কি ব্যবসা দেবে?- না। বাংলা ট্রিবিউন